শেয়ার বাজার বা পুঁজিবাজার হলো এমন এক ধরনের মাধ্যম যেখানে শেয়ার বা স্টক কেনাবেচা করা হয়। যেখানে কোম্পানি গুলো স্টক এক্সচেঞ্জের (Stock Exchange) মাধ্যমে তাদের শেয়ার কেনা বেচা করে থাকে । বাংলাদেশে প্রধান দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ হল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE ) এবং ২য় স্টক এক্সচেঞ্জ হল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ(CSE)। এদের নিয়ন্ত্রন করার জন্য আছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)।
একটি স্টক মার্কেট হল এমন একটি জায়গা যেখানে বিভিন্ন সীমিত দায়ে কোম্পানি (পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি) স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত হয়, তাদের শেয়ার লেনদেন হয়।
পৃথিবীর যতটা উন্নত দেশ আছে প্রতিটি দেশের স্টক এক্সচেঞ্জ হলো একটা অর্থনীতিক ভিত্তি। পৃথিবীর সব দেশে শেয়ার বাজার একটা গতিশীল, সহজে টাকা তোলা ও বিনিয়োগ করার সহজ মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ার বাজার প্রায় পুরাই বিপরীত। এর অন্যতম কারণ অস্বচ্ছতা, আইন কানুনের সঠিক প্রয়োগ না করা ও সর্ব শেষে সর্ষের ভেতরে ভূতের কথা না বললেই নয়।
বাংলাদেশে যতগুলি তালিকাভুক্ত কোম্পানি আছে তাদেরকে স্বচ্ছতায় নেয়া খুবই জরুরী। এইতো কিছু দিন আগে ওরিয়ন ইনফিউশনে আমরা গতিবিধি দেখেছি, কি অবস্থা দেখেছি?! মালিকপক্ষ জড়িত না থাকলে, এমনটা করা কি সম্ভব ছিল?! গত দুই-তিন বছর আগেও আমরা দেখেছি মুন্ন সিরামিক গ্রুপের এই অবস্থা ছিল। এইভাবে এই মার্কেট চলছে আর কতদিন এভাবে চলবে?!
আমাদের বর্তমান মাননীয় কমিশনার সাহেব আসার পরে যতটা আইপিও নিয়ে এসেছেন, এর মধ্যে কয়েকটা শেয়ার মার্কেটে আসার উপযুক্ত ছিল। বাকি গুলো একেবারেই যোগ্য ছিলনা। তবে কমিশনের সাহেব উনি যদি নাও চান, এই মার্কেটে আইপিএ আসবে, কারণ এই মার্কেটে আরো অনেকে বসে আছেন, তাদের ম্যানোপুলেশন সহ বাজার চালাতে হয়।
এই মার্কেটে স্বচ্ছতা আনতে হলে জবাবদিহিতা আওতায় নিয়ে আসতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকেও। এর দায়িত্ব কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জেরও আছে? সব দায় দায়িত্ব দিয়ে দেন কমিশনারের উপরে!
অবশ্যই বাজারকে আরো ভালো করতে সব কিছুকে কিভাবে বাজার সংস্কার করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ গুলো ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশে সহ আরো যত সংস্থা আছে। অনেক সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অনেক বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। প্রয়োজন হলে তাদের অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে। বিনিয়োগকারী কনফারেন্স করে। দুঃখজনক হলেও বলতে হয় নীতিনির্ধারক এবং বাজারের প্রাণ, (প্রান্তিক ও সর্বোচ্চ সংখক) বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাক্য বিনিময়ের কোন মাধ্যম নেই।
কিছু অফিসিয়াল ও সৎ মার্কেট মেকারদেরকে দায়িত্ব দেয়া জরুরী। যদি তাদের দায়িত্ব দেওয়া না হয়, এই ভাবে শেয়ার নিয়ে নোংরা গেম করে, টাকা বাজার থেকে চলে যাবে। এবং তারপর বাজারের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকবে। আমরা গত কয়েক বছরের বাজারের স্বভাব এটাই দেখেছি।
করোনার পরে ইন্সুরেন্সের যে অবস্থা হয়েছিল, প্রতিটি শেয়ার গেম করা করেছে। এই টাকা কিন্তু সবই বাজার থেকে বের করে নিয়ে গেছে। জুয়াড়ি এই দেশে তাদের সঠিক সময়ে আসে কুকর্মের জন্য শেয়ার বাজারে। পাশাপাশি যারা সাধারণ ও ছোট বিনিয়োগকারী আছেন তারা সবসময় এই বাজারে বিনিয়োগ করে এবং ধোঁকা খায়। বলাই বাহুল্য সাধারণ ও ছোট বিনিয়োগকারী বাজারেরই প্রাণ। সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কে স্বচ্ছতার মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে, যা স্বাভাবিক ভাবেই চলমান থাকা উচিত ছিল। তাহলে বাজার বাড়বে।
আমি মনে করি যত আইপিও আসবে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব আইপিও শুধুমাত্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দেওয়া উচিত, কোনো প্রতিষ্ঠানকে নয়। যেহেতু নীতিনির্ধারকরা বলে থাকেন- ইনস্টিটিউটরা বাজারে তেমন কোন ভুমিকা রাখেনা। তারপরও কেন তাদেরকে বেশি সুযোগ সুবিধা সহ আইপিও সুবিধাও দেয়া হয়?! তাদেরকে সুযোগ সুবিধা কমিয়ে দিলে তারাও বাজার উন্নয়নে কাজ করতো।
যে কোম্পানি পরিচালকদের ৩০% শেয়ার থাকবে না, তাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন পরিচালক নেয়ার ব্যাবস্থা করা দরকার। যে আইন কানুন আছে সব গুলোর সঠিক প্রয়োগ করা জরুরী।
প্রতিটি দেশের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড অনেক শক্তিশালী, এখানে অনেক মানুষ বিনিয়োগ করেন। দীর্ঘ সময়ের ডিভিডেন্ট জন্য, কিন্তু আমাদের দেশে মানুষের বিনয়োগ করতে চায় না মিউচুয়াল ফান্ডের সার্বিক অবস্থা দেখে।
বাজারে বিদ্যমান মার্জিন লোন একটি বিষ ফোঁড়ার ন্যায়। বাজার যখন অনেক বাড়ে তখন ইন্সটিটিউট গুলি বিনিয়োগকারীদের লোন দেয় এবং তাদের লোন নেয়ার জন্যে পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাজার যখন পতনে থাকে তখন লোণ দেয়না। কিন্তু সে সময় লোণ পেলে প্রকৃত পক্ষে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারতো, এখানে উল্টা নীতি।
বাজার যখন পতন হয়, তখন শেয়ার ফোর্স সেল করে দেয়। বাজার বাড়লে লোন দেয়ার ক্ষেত্রে চরম অনিয়ম লোক মুখে শোনা যায়। এটা সঠিক ভাবে তদারকি না হবার কারণে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বারবার। আশ্চর্য জনক হলেও সত্য মার্জিন লোনের কারণে বাজার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিশেষে বলবো বাজার উন্নয়নে সব পক্ষকে দক্ষতা ও সততার সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নিয়মকানুন করতে হবে সাথে সুপ্রয়োগ করতে হবে। বাজারের কল্যানের জন্যে, সর্বোপরি দেশের কল্যাণের জন্য, দেশের অর্থনীতি উন্নয়নের জন্য।
লিখেছেন
আনোয়ার আলমগীর
শেয়ার বাজার বিনিয়োগকারী
সিলেট