অর্থ লিপি

৬ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

বাফেটের ‘ধৈর্য’ তত্ত্ব বনাম বাংলাদেশের শেয়ারবাজার: ধৈর্য ধরলেই কি টাকা ফেরে?

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

“শেয়ারবাজার হলো এমন এক মাধ্যম, যা অধৈর্য ব্যক্তির পকেট থেকে টাকা ধৈর্যশীল ব্যক্তির পকেটে স্থানান্তর করে।”

ওয়ারেন বাফেটের বহুল উদ্ধৃত এই কথাটি শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন তুলে ধরে। ভালো কোম্পানি, শক্তিশালী মৌলভিত্তি এবং যুক্তিসংগত মূল্যায়নে বিনিয়োগ করে বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে অপেক্ষা করতে পারলে সময় অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীর পক্ষে কাজ করতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বাস্তবতায় এই দর্শন কি সব শেয়ারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য?

আমাদের বাজারের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে তালিকাভুক্ত থাকা বেশ কিছু দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি, সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন এবং বিভিন্ন সময়ে ওঠা অনিয়ম বা কারসাজির অভিযোগ বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে শুধু একটি শেয়ার কিনে বছরের পর বছর ধরে রাখলেই সেটি একসময় ভালো বিনিয়োগে পরিণত হবে, এমন ধারণা বাংলাদেশের বাজারে সব ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়।

তাহলে কি বাফেট ভুল?

না। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত, আমরা কি বাফেটের বক্তব্যের পুরো দর্শনটি বুঝে প্রয়োগ করছি?

বাফেটের দর্শনকে শুধু ‘শেয়ার কিনে দীর্ঘদিন ধরে রাখো’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর বিনিয়োগ দর্শনের সঙ্গে ভালো ব্যবসা চিহ্নিত করা, কোম্পানির মৌলভিত্তি বোঝা, যুক্তিসংগত মূল্যায়নে বিনিয়োগ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখার বিষয়গুলোও জড়িত।

অর্থাৎ ধৈর্য নিজে কোনো বিনিয়োগ কৌশল নয়। সঠিক বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হলে ধৈর্য একটি শক্তিশালী কৌশলে পরিণত হয়।

অধৈর্য বিনিয়োগকারী কি সব সময় হেরে যান?

বাংলাদেশের বাজারে এর উত্তরও একেবারে সরল নয়।

অনেক বিনিয়োগকারী দ্রুত মুনাফার আশায় গুজব, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পরামর্শের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে শেয়ারের দাম কমে গেলে কেউ কেউ আতঙ্কিত হয়ে লোকসানে বিক্রি করেন।

এখানে বাফেটের কথাটি প্রাসঙ্গিক। একজন বিনিয়োগকারী যদি কোম্পানির ব্যবসা ও মৌলভিত্তি যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু দ্রুত লাভের আশায় বাজারে প্রবেশ করেন এবং সামান্য দরপতনেই বেরিয়ে যান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিনিয়োগকারী তুলনামূলক কম দামে সেই শেয়ার কেনার সুযোগ পেতে পারেন।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

যে শেয়ারের মৌলভিত্তিই দুর্বল, সেখানে ধৈর্য ধরবেন কতদিন?

দুর্বল শেয়ারে ধৈর্য, নাকি ভুল সিদ্ধান্তে আটকে থাকা?

ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী কোনো শেয়ারে ভালো মুনাফার সম্ভাবনার কথা শুনে বিনিয়োগ করলেন। পরে শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেল।এখন তিনি যদি বলেন, “আমি বাফেটের নিয়ম মেনে ধৈর্য ধরব”, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, তিনি কি সত্যিই বাফেটের দর্শন অনুসরণ করছেন?

কারণ বাফেটের দর্শনে ভালো ব্যবসার মালিকানা ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিতে শুধু লোকসান হয়েছে বলে বছরের পর বছর আটকে থাকা আর ভালো কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এক বিষয় নয়।

লোকসানে থাকা মানেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নয়। এই পার্থক্যটি নতুন বিনিয়োগকারীদের বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

ট্রেডভিত্তিক পারফরম্যান্সের বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে

শেয়ারবাজারের আরেকটি বিষয় হলো ট্রেডার বা কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পদ্ধতি।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে লেনদেনভিত্তিক কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বেশি লেনদেনের দিকে একটি প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে ঘন ঘন কেনাবেচার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে এটি সব প্রতিষ্ঠান বা সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন সাধারণীকরণও ঠিক হবে না। অনেক পেশাদার কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগকারীর স্বার্থ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন।

তবু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, কারণ একজন বিনিয়োগকারীর জন্য সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং লেনদেনের পরিমাণ সব সময় একই বিষয় নয়।

‘ফিডিং আইটেম’ নিয়ে আলোচনাও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন

বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ‘ফিডিং আইটেম’ নামে একটি অনানুষ্ঠানিক শব্দ ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা বা বাজারের আলোচনায় এমন অভিযোগও শোনা যায় যে, কখনো কখনো তুলনামূলক দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য অতিরিক্ত আশাবাদী প্রত্যাশা তৈরি করা হয়।

তবে এ ধরনের অভিযোগকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা শেয়ারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়।

তবু বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো শেয়ারে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত যদি স্বাধীন বিশ্লেষণের পরিবর্তে কেবল কারও মৌখিক পরামর্শ, সম্ভাব্য মুনাফার প্রতিশ্রুতি বা বাজারের গুঞ্জনের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়, তাহলে ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

তাহলে দায় কার?

শুধু বিনিয়োগকারীর নয়, আবার শুধু বাজারব্যবস্থারও নয়। একজন বিনিয়োগকারীর লোভ, অধৈর্যতা এবং দ্রুত মুনাফার আকাঙ্ক্ষা যেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে, তেমনি বাজারের দুর্বল কাঠামো, তথ্যের অসমতা, দুর্বল কোম্পানি, সুশাসনের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ-পরামর্শের মানও বিনিয়োগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই একটি কার্যকর শেয়ারবাজার তৈরি করতে হলে শুধু বিনিয়োগকারীদের ‘ধৈর্য ধরুন’ বললেই হবে না।প্রশ্ন করতে হবে:

কোম্পানিটি কেন তালিকাভুক্ত হলো?

তার ব্যবসা কতটা শক্তিশালী?

তথ্য কতটা স্বচ্ছ?

পরিচালনা পর্ষদের সুশাসন কেমন?

শেয়ারের মূল্যায়ন কতটা যৌক্তিক?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিনিয়োগকারী যে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য?

‘সস্তা’ শেয়ার আর ‘সস্তা মূল্য’ এক নয়

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে অনেক সময় কম দামের শেয়ারকে ‘সস্তা’ মনে করা হয়। কিন্তু একটি ২০ টাকার শেয়ার ২০০ টাকার শেয়ারের তুলনায় সস্তা, এমন ধারণা মৌলিকভাবে সঠিক নয়।একইভাবে, একটি শেয়ারের দাম অনেক কমে গেছে বলেই সেটি আকর্ষণীয় হয়ে যায় না। দাম কম হওয়া এবং মূল্য কম হওয়া এক বিষয় নয়।ভালো বিনিয়োগের জন্য তাই শুধু শেয়ারের বর্তমান বাজারদর নয়, কোম্পানির আয়, সম্পদ, ঋণ, নগদ প্রবাহ, ব্যবসার সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাফেটের উক্তির আসল শিক্ষা কোথায়?

সম্ভবত শিক্ষা হলো, অধৈর্য হয়ে ভালো বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে যাবেন না।

কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা প্রয়োজন:

ভুল বিনিয়োগকে শুধু ধৈর্যের নামে আঁকড়ে ধরে থাকাও বিনিয়োগদর্শনের উদ্দেশ্য নয়।

একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীর ধৈর্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিজের বিনিয়োগের যুক্তি নিয়মিত পর্যালোচনা করার ক্ষমতা।কোম্পানির মৌলভিত্তি ঠিক থাকলে বাজারের সাময়িক পতন ধৈর্যের পরীক্ষা হতে পারে।

আর কোম্পানির মৌলভিত্তি যদি দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই অবস্থাকে শুধু ‘ধৈর্যের পরীক্ষা’ হিসেবে দেখার আগে বিনিয়োগের মূল যুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বাজারে বাফেটকে অনুসরণ করার আগে যে প্রশ্নটি করা দরকার

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়:

“কতদিন শেয়ারটি ধরে রাখব?”

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:

“আমি যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছি, সেটি কি দীর্ঘদিন ধরে রাখার মতো ব্যবসা?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলে বাফেটের ‘ধৈর্য’ দর্শনকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে বোঝা সম্ভব।

কারণ,

ধৈর্য রাখুন, কিন্তু যুক্তি হারাবেন না।
সময় দিন, কিন্তু তথ্য যাচাই করে।
বিনিয়োগ করুন, কিন্তু শুধু দামের দিকে তাকিয়ে নয়, কোম্পানির মূল্য বুঝে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বাস্তবতায় বাফেটের দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এটাই: ধৈর্য বিনিয়োগের শক্তি, কিন্তু সঠিক বিনিয়োগ ছাড়া শুধু ধৈর্য কোনো কৌশল নয়।

Author

  • মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।

    View all posts
Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।