তিনি স্বার্থহীন এক দেশপ্রেমিক ছিলেন। তিনি সত্য বলেছেন নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে। দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য যা ভালো মনে করেন তা বলে গেছেন ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে। তিনি বীর মুক্তিযাদ্ধা, তিনি চিকিৎসক, তিনি সমাজচিন্তক ও সংস্কারক ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গত রাত ১১টার দিকে তিনি চলে গেলেন চিরবিদায় নিয়ে। সব কিছু ছিন্ন করে এক নিরব জগতে।
বাংলাদেশের সব মানুষ হয়তো জানেন না তিনি তাদের কত বড় উপকার করে গেছেন। ৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা, জাফর স্যার ১৯৮২ সালে নতুনধারার এক ওষুধ নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ওষুধ কে সহজলভ্য করে গেছেন। সবচেয়ে বড় কথা উনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, আমাদের দেশের আমরা সবাই অসাধারণ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। জাফর স্যার তার বেশভূষা চালচলন সব কিছুর মাধ্যমে নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
সততা, নির্লোভ, সাদামাটা জীবন ও সাহসিকতায় ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন অনন্য। গরিব, অসহায় ও দুস্থদের পরম আত্মার আত্মীয়। পিতৃসুলভ ভালোবাসায় গণমানুষের সেবা করে গেছেন মৃত্যু অবধি। এই অর্থেই তিনি ক্ষণজন্মা, একজন স্বপ্নবাজ সফল মানুষ।
৮১ বছরের জীবনে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন পর্বতচূড়ায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা ছিলেন, রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে প্রাণ বাঁচিয়েছেন অসংখ্য আহত মুক্তিযোদ্ধার। তাঁর প্রচেষ্টায় চিকিৎসাসেবা হতদরিদ্র মানুষের হাতের নাগালে ছিল। সক্রিয় রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে রাজনীতির মোহ তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন ডাঃ জাফরুল্লাহ। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের করেছেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মী। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে প্রথম উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি। জনকল্যাণধর্মী চিকিৎসানীতির মাধ্যমে দেশের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি প্রণয়ন, জাতীয় শিক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে অগ্রসর শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং নারী উন্নয়নে রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। ১৯৮২ সালে জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকার কারণে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানির মাধ্যমে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সরকার ও রাষ্ট্র, ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক নানা উত্থান-পতনের মধ্যে সংকট উত্তরণে দূতিয়ালি করেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেও দেশ ও জনগণের জন্য সর্বোচ্চটুকু দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রতিটি ন্যায্য দাবির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন ডাঃ জাফরুল্লাহ। কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে শরিক ছিলেন। ক্ষমতার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছেন বারবার।
কীর্তিমান এই মহানায়কের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে। বড় হয়েছেন ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে (ডিএমসি)। ছাত্র ইউনিয়নের মেডিক্যাল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে ডিএমসি থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে লন্ডনের রয়াল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি।
পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইড পার্কে যে কয়েকজন বাঙালি পাসপোর্ট ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন, তাঁদের একজন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এরপর ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে রাষ্ট্রহীন নাগরিকের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে সংগ্রহ করেন ভারতীয় ভিসা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ তে ডাঃ জাফরুল্লাহর দেশে ফেরার গল্প তুলে ধরেছিলেন।
আহত মুক্তিযোদ্ধা, উদ্বাস্তু ও নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নর-নারীর জরুরি চিকিৎসাসেবায় আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরের একটি আনারসবাগানে গড়ে তোলেন প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল—‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। প্রশিক্ষিত নার্স না থাকায় নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেন ডাঃ জাফরুল্লাহ। মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে বহনকারী যে হেলিকপ্টারটি হামলার শিকার হয়েছিল তাতে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ডাঃ জাফরুল্লাহ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে গড়ে তোলেন কুমিল্লায়। পরে সেটি স্থানান্তর করেন সাভারে। এই ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামটি দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
গ্লোবাল প্যারামেডিক কনসেপ্ট ও ট্রেইন্ড প্যারামেডিক দিয়ে মিনি ল্যাপারোটমির মাধ্যমে লাইগেশন সার্জারির উদ্ভাবক ডাঃ জাফরুল্লাহ। এ সংক্রান্ত তাঁর পেপারটি বিশ্ববিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে মূল আর্টিকল হিসেবে ছাপা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল পেডিয়াট্রিকস টেক্সট বইয়ের একটা চ্যাপ্টারে লিখেছেন অনেক বছর ধরে। দেশে-বিদেশে তাঁর লেখা বই ও পেপারের সংখ্যা প্রচুর। প্রাইমারি কেয়ার নিয়ে লেখা তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত একটি বই ‘যেখানে ডাক্তার নেই’ একসময় অবশ্য পাঠ্য ছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের লক্ষ্যে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সাল থেকেই জাতীয় শিক্ষা কমিটি ও নারী কমিটির সদস্য ছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশে শিক্ষা ও নারীনীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে জাতীয় ওষুধনীতি। তাঁর প্রচেষ্টায় আমদানি ওষুধের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২৫-এ। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ওষুধ রপ্তানিকারক দেশে। অথচ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ১৯৯২ সালে তাঁর সদস্য পদ বাতিল করেছিল বিএমএ।
স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের সময়ে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। জিয়াউর রহমান মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দিলে বিএনপিতে স্বাধীনতাবিরোধী থাকায় চার পৃষ্ঠার চিঠির মাধ্যমে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালে জিয়ার গড়া প্রথম জাতীয় মহিলা উন্নয়ন কমিটির দুই পুরুষ সদস্যের একজন হিসেবে প্রাথমিকে ৫০ শতাংশ মহিলা শিক্ষক এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ছাত্রী নেওয়ার সুযোগ করেছিলেন, যা কার্যকর হয়েছিল এরশাদ আমলে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এইচ এম এরশাদও। এরশাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও তাঁর পরামর্শেই ওই আমলে পোস্টার, বিলবোর্ড বাংলায় লেখা এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন, উপজেলা ব্যবস্থা ও সফল জাতীয় ঔষধনীতি ও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি করেছিলেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দাপ্তরিক কাজ হয় বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে। বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ সার্ভিসের এই আইকন সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পদক পান ১৯৭৭ সালে পদকটি প্রবর্তনের বছর। বিকল্প নোবেল খ্যাত র্যামন ম্যাগসেসাই পান ১৯৮৫ সালে। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে সুইডিশ ইয়ুথ পিস প্রাইজ, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেনের লাইভ লাই হুড পুরস্কার, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথ হিরোজ পুরস্কার লাভ করেন।
সারা দেশে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৪০টি পাবলিক হেলথ সেন্টার, বৃহৎ কিডনি ডায়ালিসিস সেন্টার, ক্যান্সার হাসপাতাল, ধানমণ্ডি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সাভারে দৃষ্টিনন্দন সবুজঘেরা সুবিশাল এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল ও ফিজিওথেরাপি কলেজ, পাবলিক হেলথ সেন্টার।