অর্থ লিপি

৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ: সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ বনাম বাজার পতন, কেমন ছিল তার সিদ্ধান্তগুলো?

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

দেশের পুঁজিবাজারে এক অস্থির ও ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অভিজ্ঞ ব্যাংকার রাশেদ মাকসুদ। বিগত সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল তার সামনে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত কয়েক মাসে তিনি বেশ কিছু প্রশংসনীয় ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বাজারের দরপতন ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভের মুখেও পড়েছেন।

রাশেদ মাকসুদের নেওয়া প্রধান ভালো সিদ্ধান্ত, কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং তারকাজের সামগ্রিক মূল্যায়নের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশংসনীয় ও ভালো সিদ্ধান্তসমূহ

পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিয়ম দূর করতে রাশেদ মাকসুদ বেশ কিছুসাহসী সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা বাজারে সুশাসন ফেরাতে সাহায্যকরছে:

কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনেরমাফিয়াচক্রএবং চিহ্নিত কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণকরেন। বিতর্কিত লটারী কিং, বড় বড় কারসাজিকারী এবং সাবেক প্রভাবশালীব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণ জরিমানা এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের মতোকঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটি গঠন ও অনিয়ম উদ্ঘাটন: বিগত বছরগুলোতে বেক্সিমকোসহ বিভিন্নকোম্পানির শেয়ার দর কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর রহস্য উদঘাটনে শক্তিশালী তদন্তকমিটি গঠন করেছেন। অনিয়মের সাথে জড়িত বিএসইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদেরবিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।

ফ্লোর প্রাইসের স্থায়ী বিদায় ও কৃত্রিমতা দূর: বাজারকে কোনো ধরনের কৃত্রিমসাপোর্ট (যেমন ফ্লোর প্রাইস) দিয়ে ধরে না রেখে, বাজারের স্বাভাবিক গতিতেচলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে বাজার সাময়িক কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তাবাজারের গভীরতা বাড়াবে।

স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ: আইপিও (IPO) অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোরযাচাইবাছাই এবং দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধে কড়াকড়ি আরোপ করাহয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন (Corporate Governance) নিশ্চিত করতেকোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ভুল বা বিতর্কিত সিদ্ধান্তসমূহ

ভালো উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও, কিছু কৌশলী ভুলের কারণে বাজারে তীব্র তারল্য সংকটএবং সূচকের বড় পতন ঘটেছে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা:

অতিরিক্ত কড়াকড়িতে তারল্য সংকট: দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই একসাথে অনেকবড় বড় বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ এবং তদন্তশুরু করায় বাজারে এক ধরনেরপ্যানিকবা আতঙ্ক তৈরি হয়। ফলে বড় মূলধনবাজার থেকে সড়ে যায় এবং বাজারে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয়।

সমন্বয়হীন ‘জেড’ ক্যাটাগরি পলিসি: দুর্বল বা লভ্যাংশ না দেওয়াকোম্পানিগুলোকে হুট করেজেডক্যাটাগরিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি বাজারেরজন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করতে নাপেরে আটকে যান এবং সূচকের ধারাবাহিক পতন ঘটে। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তসংশোধন করতে বাধ্য হয় বিএসইসি।

বাজারের সেন্টিমেন্ট বুঝতে না পারা: পুজিবাজার আর বাণিজ্যিক ব্যাংকপরিচালনার নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমালোচকদের মতে, একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারহিসেবে রাশেদ মাকসুদ কঠোর আইন প্রয়োগের দিকে যতটা মনোযোগ দিয়েছেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ব (Market Sentiment) এবং তারল্য প্রবাহসচল রাখার দিকে ততটা নজর দিতে পারেননি।

ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বা প্রণোদনার অভাব: ধারাবাহিক দরপতনের ফলেসাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যখন নিঃস্ব হচ্ছিলেন, তখন বাজারকে স্থিতিশীলকরার জন্য কোনো তাৎক্ষণিক তহবিল বা সাপোর্ট বা প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুতনিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সামগ্রিক কাজের মূল্যায়ন

রাশেদ মাকসুদের যাবৎকালের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, নিয়ত ও উদ্দেশ্য সৎ হলেও বাস্তবায়নের কৌশলে কিছু ঘাটতি ছিল।

তিনি পুঁজিবাজারের ক্যান্সার বা অনিয়ম দূর করতেসার্জারিশুরু করেছেন, যাবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সার্জারির আগেরোগীকে যে অ্যানেস্থেসিয়া বা রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করতে হয়, সেখানেকিছুটা ঘাটতি ছিল। ফলে বাজারে রক্তক্ষরণ (সূচকের পতন) হয়েছে বেশি।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে:

রাশেদ মাকসুদ পুঁজিবাজারে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাঁর নেতৃত্বে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, আইনকানুনের প্রয়োগএবং অনিয়মদুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অনেকের কাছেই ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই একটি পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। বাজারকে টেকসইভাবে শক্তিশালী করতে হলে একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য সরবরাহ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা অনেকাংশে অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণেও হতে পারে।

তবুও একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে, তিনি অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষ দিন পর্যন্ত দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

তাঁর সময়ে প্রণীত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন, বিধিমালা সংস্কারমূলক উদ্যোগ যদি আরও বহু বছর আগে বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ হয়তো আরও অনেক পরিণত, শক্তিশালী উচ্চ অবস্থানে পৌঁছাতে পারত।

নতুন নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন শৃঙ্খলা সুশাসনের এই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাজারে আস্থা, তারল্য বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।