দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের মধ্যে ইদানীং নিজের হাতে থাকা শেয়ার পরিবারের সদস্য বা নিকটজনদের ‘উপহার’ (Gift) হিসেবে দেওয়ার এক নতুন প্রবণতা লক্ষ্য যাচ্ছে।
এভাবে নিজের লোকজনকে (সাধারণ হোল্ডারদের) শেয়ার হস্তান্তর করে মালিকপক্ষের শেয়ার বিক্রির উদ্দেশ্য কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখা ও তদারকি করা উচিত বাজারের স্বার্থে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ইতিপূর্বে অনেক কোম্পানির মালিকপক্ষ এভাবে শেয়ার উপহার হিসেবে শেয়ার হস্তান্তর করেছে মূলত শেয়ার বিক্রির উদ্দেশ্যে।
কখনো কখনো মালিকপক্ষ এভাবে বিভিন্ন বাজার ম্যানুপুলেটকারীদেরকে শেয়ার দেয়ার জন্যে ও উপহার হিসেবে শেয়ার হস্তান্তর করেছেন। কেননা মালিকপক্ষ শেয়ার ঘোষণা ছাড়া বিক্রি করতে পারেনা। তাই তারা শেয়ার বিক্রির উদ্দেশ্যে উপহার হিসাবেশেয়ার হস্তান্তর করে থাকেন পরিবারের সদস্যদের মাঝে।
সম্প্রতি প্রিমিয়ার সিমেন্ট, জিপিএইচ ইস্পাত এবং ক্রাউন সিমেন্টের মতো বড়কোম্পানির মূল মালিকপক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণা আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য শেয়ার হস্তান্তর:
বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল বেশ কয়েকজন বড় উদ্যোক্তাপরিচালক তাদের বিশাল অংকের শেয়ার পরিবারের সদস্যদের নামে হস্তান্তরেরঘোষণা দিয়েছেন।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট (PREMIERCEM):
স্পন্সর ডিরেক্টর জনাব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম তার হাতে থাকা ৭৮ লাখ ২৫ হাজার৩১৩টি শেয়ারের মধ্যে ৪৫ লাখ শেয়ার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে উপহার হিসেবে দিচ্ছেন।
জিপিএইচ ইস্পাত (GPHISPAT):
একই উদ্যোক্তা জনাব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমএই কোম্পানিরও ৩ কোটি ৫০ লাখ শেয়ার তার পরিবারের সদস্যদের নামে হস্তান্তরকরছেন।
ক্রাউন সিমেন্ট (CROWNCEMNT):
পরিচালক জনাব মো. আলমগীর কবির তারহোল্ডিংয়ের ৮৪ লাখ ২৭ হাজার শেয়ার থেকে ৪৬ লাখ শেয়ার স্ত্রী ও সন্তানদের উপহারদিচ্ছেন।
এছাড়া জনাব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এই কোম্পানির আরও ১ কোটি ৪০ লাখশেয়ার একইভাবে পরিবারের সদস্যদের হস্তান্তর করার ঘোষণা দিয়েছেন।
কেন এই উপহার? নেপথ্যের কারণ নিয়ে সংশয়:
নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা বাপরিচালক শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে আগেভাগে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ঘোষণাদিতে হয়। কিন্তু পরিবারের সদস্য বা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে ‘উপহার’ হিসেবেশেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই জটিলতা অনেকটা কম। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এইপ্রবণতার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:
১. বিক্রির আগাম কৌশল:
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, মালিকপক্ষ সরাসরি বিক্রির ঘোষণা দিলে বাজারেনেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বা শেয়ারের দাম কমে যেতে পারে। তাই ‘সাধারণশেয়ারহোল্ডার’ হিসেবে পরিবারের সদস্যদের কাছে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়, যাতেপরবর্তীতে তারা কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবেবাজারে শেয়ারগুলো বিক্রি করে দিতে পারেন।
২. নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানিপুলেশন:
অনেক সময় বাজার ম্যানিপুলেটর বা সিন্ডিকেটের সুবিধার্থে মালিকপক্ষ সরাসরিশেয়ার দিতে পারে না। উপহারের মাধ্যমে শেয়ারগুলো সাধারণ শ্রেণিতে নিয়ে আসার পর তা লেনদেন করা সহজ হয়।
৩. ট্যাক্স ও আইনি সুবিধা:
উপহার হিসেবে শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অনেক সময় করসুবিধা বা আইনি শিথিলতা পাওয়ার সুযোগ থাকে, যা সাধারণ বিক্রির ক্ষেত্রে পাওয়াযায় না।
খতিয়ে দেখা জরুরি:
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে বিপুল পরিমাণ শেয়ার ‘গিফট’ হিসেবেহস্তান্তরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ডএক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখাউচিত।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে দেখা প্রয়োজন যে, এই শেয়ারগুলো উপহার পাওয়ার পরনিকটজনরা তা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন কি না। যদি উপহারের আড়ালে বড়অংকের শেয়ার বিক্রির উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড়ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বাজারের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এই ‘উপহারসংস্কৃতি’র লাগাম টানা এবং তদারকি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।