দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে প্রথমেই বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের প্রক্রিয়াকে সম্মান করতে হবে। শেয়ারের দাম বাড়া বা কমা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাই কোনো অনিয়ম বা কারসাজির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শুধু দাম বাড়ছে কিংবা কমছে, এমন কারণেই বাজারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি কার্যকর পুঁজিবাজার মূলত চাহিদা ও যোগানের সমন্বয়েই চলে। কোনো শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়লে চাহিদা বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়তে পারে। আবার বিক্রির চাপ বাড়লে দাম কমবে। এই উত্থান-পতনই বাজারের স্বাভাবিক গতি। পৃথিবীর সব পরিণত পুঁজিবাজারেই প্রতিদিন শেয়ারের দাম ওঠানামা করে। বরং এই ওঠানামাই একটি জীবন্ত বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে অনিয়ম বা কারসাজি হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নীরব থাকবে। বরং সেখানেই নিয়ন্ত্রকের প্রকৃত ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়াল ট্রেডিং, কৃত্রিমভাবে লেনদেন বাড়ানো, কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো শেয়ারের দাম ধারাবাহিকভাবে কমলে যদি শুধু দাম কমার কারণে তদন্ত, অনুসন্ধান বা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন না হয়, তাহলে দাম বাড়লেই কেন একই ধরনের সন্দেহ বা পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
শুধু মূল্যবৃদ্ধি কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। একটি শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে কোম্পানির মৌলভিত্তি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, করপোরেট ঘোষণা, বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কিংবা চাহিদা বৃদ্ধিসহ নানা বৈধ কারণ থাকতে পারে। তাই অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক এবং লেনদেনের তথ্য ও আচরণ বিশ্লেষণনির্ভর।
একইভাবে, কোনো বিনিয়োগকারী বৈধভাবে একটি শেয়ার কিনছেন এবং বাজারের চাহিদার কারণে তার দাম বাড়ছে, তখন শুধু মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভয় বা চাপের পরিবেশ তৈরি হলে স্বাভাবিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা হওয়া উচিত দাম নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বাজারের নিয়ম ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। বাজারের দিক নির্ধারণ করবে চাহিদা ও যোগান। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করবে, সেই চাহিদা ও যোগান যেন কারসাজি, কৃত্রিম লেনদেন বা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে বিকৃত না হয়।
শেয়ারবাজারে উত্থান থাকবে, পতনও থাকবে। উত্থান-পতনহীন বাজার কোনো জীবন্ত বাজার নয়। বিনিয়োগের সঙ্গে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি ঝুঁকির সঙ্গেই সুযোগও তৈরি হয়। তাই বাজারকে কৃত্রিমভাবে স্থির রাখার পরিবর্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সমান আচরণ এবং আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান লক্ষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাম কমলে স্বাভাবিক পতন আর দাম বাড়লেই সন্দেহ, এমন দ্বৈত মানদণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দাম বাড়ুক কিংবা কমুক, উভয় ক্ষেত্রেই একই নিয়ম, একই নীতি এবং একই ধরনের নিরপেক্ষতা প্রয়োগ করতে হবে।
শেয়ারবাজারকে টেকসই করতে হলে অযাচিত হস্তক্ষেপের পরিবর্তে প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত ও দমনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কার্যকর হতে হবে। বিনিয়োগকারীরা তখনই আস্থা ফিরে পাবেন, যখন তারা দেখবেন বাজারে বৈধ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে সম্মান করা হচ্ছে এবং অনিয়ম হলে প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাজার চলবে চাহিদা ও যোগানে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করবে সেই বাজার যেন স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও কারসাজিমুক্ত থাকে।
কারণ একটি সুস্থ পুঁজিবাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ নয়, আস্থা ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।