সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব, অনুমাননির্ভর প্রচারণা ও নেতিবাচক তথ্যের প্রভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। এর সঙ্গে দুর্বল হচ্ছে বাজারের ওপর আস্থার জায়গাটিও।
চলতি সপ্তাহের প্রথম তিন কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ১০৬ পয়েন্টের বেশি কমেছে। ধারাবাহিক বিক্রয়চাপের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্য ও গুঞ্জন বাজারের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। দিনের লেনদেন শেষে প্রায় সবকটি প্রধান সূচকই কমেছে।
দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০.৩৭ পয়েন্ট বা ০.৩৭ শতাংশ কমে ৫,৪২৪.৯০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এদিন শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৪.৯৫ পয়েন্ট বা ০.৪৬ শতাংশ কমে ১,০৭৪.৮৫ পয়েন্টে এবং নির্বাচিত ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ৪.৬৬ পয়েন্ট বা ০.২২ শতাংশ কমে ২,০৭৭.০৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
লেনদেন ৫৬৪ কোটি টাকা, কমেছে ২৭০ কোম্পানির দর
ডিএসইতে মঙ্গলবার মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ১৭৮টি লেনদেনের মাধ্যমে ১৮ কোটি ৭ লাখের বেশি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৬৪ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর মধ্যে ৭৯টির দর বেড়েছে, ২৭০টির কমেছে এবং ৪১টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
অর্থাৎ, দরপতনের প্রবণতা ছিল তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত।
বাজারে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের গুঞ্জন
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে শেয়ারবাজার নিয়ে নানা ধরনের তথ্য, বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে কিছু তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস বা আনুষ্ঠানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাজারে আলোচিত কয়েকটি গুঞ্জনের মধ্যে রয়েছে, দ্রুত ডিএসইএক্স সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যেতে পারে। কোথাও কোথাও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসের বিভিন্ন গ্রাফ ব্যবহার করে এ ধরনের পূর্বাভাসও প্রচার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া শেয়ারবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বড় ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে, এমনকি সংশ্লিষ্টদের অর্থ বা সম্পদ জব্দ হতে পারে বলেও বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা চলছে। তবে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
আরেকটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত বলে আলোচিত ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং এর প্রভাবে বাজারকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমুখী করার দাবি। এ ধরনের বক্তব্যেরও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়েও উদ্বেগ
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কথাও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে কিছু তালিকাভুক্ত উৎপাদনমুখী কোম্পানির উৎপাদন ব্যাহত বা কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির উৎপাদন বা আর্থিক কার্যক্রমে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ছে, তা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য ও আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
ফোর্সড সেল নিয়ে বাড়ছে আলোচনা
সূচকের ধারাবাহিক পতনের কারণে মার্জিন ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কাও বাজারে রয়েছে।
তবে বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ফোর্সড সেল কতটা হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংকের তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
লভ্যাংশ নিয়েও নানা গুঞ্জন
এদিকে জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম সামনে থাকায় বিভিন্ন কোম্পানির আয় ও সম্ভাব্য লভ্যাংশ নিয়ে নানা ধরনের অনুমান বাজারে ছড়াচ্ছে।
কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ বা আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুঞ্জনের পরিবর্তে কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং ডিএসই ও বিএসইসিতে প্রকাশিত তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গুজবের বাজারে বিনিয়োগকারীর করণীয়
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারে গুজব নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে অল্প সময়ে একটি অসম্পূর্ণ বা ভিত্তিহীন তথ্য বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে আতঙ্ক তৈরি হয়ে স্বাভাবিক বাজার আচরণ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
তাদের মতে, কোনো গুজবের ভিত্তিতে হঠাৎ শেয়ার কেনাবেচার সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক প্রতিবেদন, আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের অবস্থা, লভ্যাংশের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত।
বিশেষ করে কোনো কোম্পানি সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য ছড়িয়ে পড়লে সেটির সত্যতা যাচাই না করে আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি ইতিবাচক গুজবের ভিত্তিতে শেয়ার কেনাও বিনিয়োগকারীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের দ্রুত প্রকাশ, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং বিনিয়োগকারীদের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থলিপির বক্তব্য: শেয়ারবাজারে ওঠানামা স্বাভাবিক। তবে গুজব ও অনুমাননির্ভর প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত না নিয়ে যাচাই করা তথ্য ও কোম্পানির মৌলভিত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়াই বিনিয়োগকারীদের জন্য অধিক নিরাপদ পদ্ধতি।