জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানির রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
শুক্রবার (১ মে) থেকে কার্যকর এই পদক্ষেপ বিশ্বের জ্বালানির বাজারে তাত্ক্ষণিক কোনো বড় ধাক্কা না দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে মূল্য অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
সংবাদ মাধ্যম গালফ নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে চলমান ভূরাজনৈতিক সংকট। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাজারে তেল পৌঁছাতে না পারায় দাম স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে রয়েছে, যা সরবরাহ সংকটেরই প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইউএই যদি ওপেকের কোটা থেকে বেরিয়ে উৎপাদন বাড়াতেও চায়, তবুও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে না, কারণ মূল সমস্যা উৎপাদন নয়-বরং পরিবহন।
ইউএইর জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল-মাজরোউয়ি স্পষ্ট করেছেন, এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে। তার ভাষায়, এটি একটি ‘সার্বভৌম জাতীয় সিদ্ধান্ত’, যার লক্ষ্য হলো বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সাড়া দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউএই দীর্ঘদিন ধরে তেল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক উৎপাদন ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু ওপেকের উৎপাদন কোটা সেই সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করছিল। ফলে ওপেক ছাড়ার মাধ্যমে দেশটি এখন আরও স্বাধীনভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারবে।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন—এই বাড়তি উৎপাদন কি ভবিষ্যতে তেলের দাম কমিয়ে দেবে, নাকি বিশ্ব বাজারে নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে অতিরিক্ত সরবরাহ সহজেই বাজারে চাহিদা বাড়াতে পারে, কারণ বর্তমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে। ইউএইর মতো বড় উৎপাদক ওপেকের বাইরে চলে গেলে সংগঠনের সমন্বিত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে, যা মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ওপেক প্লাস জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদি অন্যান্য দেশও ইউএইর পথ অনুসরণ করে, তাহলে বাজারে ‘মার্কেট শেয়ার যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে—যেখানে প্রতিটি দেশ বেশি উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের অংশ বাড়াতে চাইবে। এর ফলে জ্বালানির দাম হঠাৎ করে ওঠানামা করার ঝুঁকি বাড়বে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন—যা ইতোমধ্যে দৈনিক ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়েছে—এবং ওপেকের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ইউএইর এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যাখ্যা আংশিক ও বিতর্কিত হওয়ায় মূল অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ইউএইর ওপেক ছাড়া তেলের দামে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তন না আনলেও, ভবিষ্যতে এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য অস্থিরতার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।