অর্থ লিপি

২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

৬ মাসে যা কামিয়েছিলেন, মাত্র ১০ দিনেই হারালেন! কোথায় গেল আস্থার বাজার?

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

গত ছয় মাসে যা লাভ করেছি, চলতি মাসের ১০-১২ কার্যদিবসেই তার চেয়ে বেশি হারিয়েছি।’

শেয়ারবাজারে এখন এই আক্ষেপই যেন অসংখ্য বিনিয়োগকারীর মুখে মুখে। দীর্ঘ সময় পর বাজারে যখন কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল, সূচক ও লেনদেনে গতি এসেছিল, অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়ছিল এবং বহু বিনিয়োগকারী পুরোনো লোকসানের কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছিলেন, তখনই হঠাৎ বদলে গেছে বাজারের চিত্র।

কয়েক মাসের ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া আস্থা যেন কয়েকটি মাত্র কার্যদিবসেই বড় ধাক্কা খেয়েছে।

ছয় মাসের স্বস্তি, দশ দিনের ধাক্কা

চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে দেশের পুঁজিবাজারে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। সংস্কার ও বাজারবান্ধব উদ্যোগের প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে DSEX ৫,৯২৬ পয়েন্ট ছাড়িয়েছিল এবং বাজারে সংস্কার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার কথাও উঠে আসে। 

এর ফলে শুধু সূচক নয়, অনেক শেয়ারের দামও বাড়ে। দীর্ঘদিনের লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ পোর্টফোলিওর ক্ষতি কিছুটা কমানোর সুযোগ পান। নতুন করে বিনিয়োগ করা অনেক বিনিয়োগকারীও স্বল্পমেয়াদে ভালো মুনাফা করেন।

কিন্তু আগস্টে এসে সেই চিত্র দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।

বিশেষ করে মার্জিন ঋণ বিধিমালার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা, বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্য, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।

মার্জিন বিধিমালা: আতঙ্কের বড় উৎস

মার্জিন ঋণ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক আলোচনা ও পরিবর্তনের কারণে বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ১৭ আগস্ট সংশোধিত মার্জিন বিধিমালা প্রকাশের পর ন্যূনতম বিনিয়োগের সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ টাকায় নামানো এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পরিবর্তনও এসেছে। 

অর্থাৎ, বাস্তব চিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের তুলনায় ভিন্ন ছিল।

কিন্তু বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। বিনিয়োগকারীরা যখন কোনো বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বোঝার আগেই বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও, কমেন্ট বা কথিত ‘ভেতরের খবর’ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন, তখন আতঙ্ক দ্রুত বিক্রির চাপে রূপ নেয়।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহেই মার্জিন বিধিমালা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি বাজার বিশ্লেষণেও উঠে এসেছিল। 

গুজব যখন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভিত্তি

শেয়ারবাজারে গুজব নতুন কিছু নয়। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটি ভুল তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কখনো কখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান বা কর্মকর্তার নামে এমন বক্তব্যও ছড়িয়ে পড়ছে, যা তারা আদৌ দেননি।

১৯ আগস্ট BSEC নিজেই সতর্ক করে জানিয়েছে, চেয়ারম্যানের নামে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও সংবাদ ছড়ানো হয়েছিল, অথচ তিনি ওই বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য দেননি। 

এটি শুধু একটি গুজবের ঘটনা নয়। এটি বাজারের তথ্যব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

কারণ একজন বিনিয়োগকারী যদি সঠিক তথ্য পাওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পান, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হতে পারেন।

পতনের পেছনে শুধু মার্জিন বিধিমালা নয়

তবে বর্তমান পতনের দায় শুধু মার্জিন বিধিমালার ওপর চাপানোও ঠিক হবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। এর সঙ্গে বড় মূলধনী শেয়ারে বিক্রির চাপ, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে উদ্বেগ এবং সামগ্রিক বিনিয়োগকারী আস্থার দুর্বলতা যুক্ত হয়েছে।

২৪ আগস্ট বড় মূলধনী শেয়ারে দরপতনের চাপ পুরো বাজারকে টেনে নামায়। ওইদিন DSEX একদিনে ৭৮.৬ পয়েন্ট বা প্রায় ১.৪ শতাংশ কমে ৫,৬৪৪ পয়েন্টে নেমে আসে। 

২৫ আগস্টও বাজার স্থিতিশীল হতে পারেনি। দিনশেষে DSEX আরও ৩.৫ পয়েন্ট কমে ৫,৬৪০ পয়েন্টে অবস্থান করে। 

অর্থাৎ, কয়েক মাসের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রার পর বাজার এখন শুধু কারিগরি সংশোধনের মধ্যেই নেই, বরং আস্থার সংকটেরও মুখোমুখি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে পড়েছেন তিন ধরনের বিনিয়োগকারী।

প্রথমত, মার্জিন ঋণগ্রহীতা বিনিয়োগকারী।
দরপতনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ইকুইটি কমে যায়। ফলে অতিরিক্ত অর্থ জমা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। বাজার আরও পড়লে বাধ্যতামূলক বিক্রির ঝুঁকিও বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, উচ্চ দামে শেয়ার কিনে নতুন করে বাজারে প্রবেশ করা বিনিয়োগকারী।
তারা কয়েক সপ্তাহ আগেও যে শেয়ারকে শক্তিশালী মনে করছিলেন, সেটির দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের কাগুজে লোকসানের মুখে পড়েছেন।

তৃতীয়ত, পুরোনো লোকসান কাটিয়ে ওঠার পথে থাকা বিনিয়োগকারী।
এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হতাশা সবচেয়ে বেশি। কারণ ছয় মাস ধরে ধীরে ধীরে যে ক্ষতি পুষিয়ে উঠছিল, মাত্র কয়েকটি বড় দরপতনে সেই লাভের বড় অংশ আবার হারিয়ে যাচ্ছে।

তাহলে কি ছয় মাসের অর্জন সব শেষ?

একেবারেই নয়।

সূচকের পতন মানেই প্রতিটি কোম্পানির মৌলভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে, এমন নয়। আবার বাজার কয়েক মাস বেড়েছে বলেই প্রতিটি শেয়ারের মূল্যায়ন যৌক্তিক হয়েছে, সেটিও নয়।

এখন বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আবেগের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত।

কোন কোম্পানির আয় বাড়ছে, কার ঋণ বেশি, কার নগদ প্রবাহ শক্তিশালী, কার ব্যবসায় বাস্তব প্রবৃদ্ধি আছে, কোন শেয়ারের মূল্যায়ন অতিরিক্ত এবং কোন শেয়ার মৌলভিত্তির তুলনায় কম দামে রয়েছে, সেগুলো আলাদা করে দেখতে হবে।

কারণ আতঙ্কের বাজারে ভালো কোম্পানিও সস্তা হতে পারে। আবার একই সময়ে দুর্বল কোম্পানির পতন আরও ভয়াবহ হতে পারে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও বড় শিক্ষা

বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

নতুন কোনো বিধিমালা বা নীতিগত পরিবর্তন বাজারে আনার আগে তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা, কার্যকর হওয়ার সময়, বিনিয়োগকারীর ওপর প্রভাব এবং বাস্তব প্রয়োগের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

কারণ বাজারে ‘অর্ধেক তথ্য’ অনেক সময় ‘ভুল তথ্যের’ মতোই ক্ষতিকর।

BSEC-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে ১৭ আগস্ট মার্জিন বিধিমালার সংশোধন এবং ২০ আগস্ট হালনাগাদ বিধিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। 

এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যদি দ্রুত, সহজ ভাষায় এবং একক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে গুজবের জায়গা অনেকটাই কমে আসবে।

বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থা

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এখন শুধু সূচক বাড়ানো নয়, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন বিনিয়োগকারী যেন বিশ্বাস করতে পারেন যে বাজারে তথ্য সবার জন্য সমানভাবে পাওয়া যায়, গুজব ছড়িয়ে কেউ সুবিধা নিতে পারে না, মূল্যসংবেদনশীল তথ্য আগাম পাচার হয় না এবং নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই।

কারণ একটি বাজারে টাকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আস্থা।

ছয় মাসে বিনিয়োগকারীরা যে আস্থা ফিরে পেয়েছিলেন, সেই আস্থা যদি মাত্র কয়েকটি গুজব, অস্পষ্ট বক্তব্য এবং আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের কারণে আবার হারিয়ে যায়, তাহলে বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করা কঠিন হবে।

বিনিয়োগকারীর ক্ষতি শুধু শেয়ারের দরে হয় না, আস্থা হারালেও ক্ষতি হয়।

আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই DSEX কত পয়েন্টে থামবে, সেটি নয়।

প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা আবার কত দ্রুত ফিরবে?

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।