শেয়ারবাজারে গুজব নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে গুজব এখন মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কোনো কোম্পানির মূল্যসংবেদনশীল তথ্য, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ কিংবা শেয়ারদর নিয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর এসব তথ্যের প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে।
কখনো কোনো কোম্পানির শেয়ারদর বাড়বে বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, আবার কখনো কোনো কোম্পানি নিয়ে নেতিবাচক তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে কেউ অতিরিক্ত দামে শেয়ার কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আবার কেউ আতঙ্কিত হয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি করে লোকসানে পড়ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে গুজব ছড়ানোর আগে বা পরে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, গুজব কি শুধুই ভুল তথ্য, নাকি কখনো কখনো পরিকল্পিতভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করার হাতিয়ার?
গুজবের খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ, পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত তথ্যের ওপর নজর রাখেন। কিন্তু সব তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ বা সক্ষমতা সবার থাকে না।
ফলে একটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক কিংবা অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি করতে পারে। এর সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ কম দামে শেয়ার সংগ্রহ কিংবা বেশি দামে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করলে ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই।
তথ্যের বাজারে শৃঙ্খলা জরুরি
শেয়ারবাজারে তথ্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কোনো কোম্পানির প্রকৃত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তথ্যকে সত্য ধরে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে শুধু বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা বাজারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তথ্য ছড়ানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
গুজব ছড়ালে শাস্তি, তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও থাকতে হবে
গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। সমালোচনা, বিশ্লেষণ, মতামত কিংবা কোনো কোম্পানির ব্যবসা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা আর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বাজারকে প্রভাবিত করা এক বিষয় নয়।
তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত একটি স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে শেয়ারদর বা লেনদেনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগ বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশের সুযোগও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়াতে হবে নজরদারি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কোন কোম্পানিকে ঘিরে হঠাৎ ব্যাপক গুজব ছড়াচ্ছে, একই সময়ে ওই শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে কি না, কারা নিয়মিত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি। কোনো ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, মেসেঞ্জার গ্রুপ বা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাকে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি না করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা যাচাই করা উচিত।
আস্থা ফেরাতে গুজবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন
শেয়ারবাজারে আস্থা শুধু ভালো সূচক বা বেশি লেনদেনের মাধ্যমে তৈরি হয় না। বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস থাকতে হবে যে বাজারে তথ্যের অপব্যবহার করে কেউ অন্যায্য সুবিধা নিতে পারবে না।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতা বন্ধে কার্যকর নজরদারি, দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদেরও হতে হবে সচেতন। গুজবের ওপর নয়, তথ্যের ওপর বিনিয়োগের সিদ্ধান্তই হতে পারে নিরাপদ ও সুস্থ পুঁজিবাজারের ভিত্তি।
কারণ একটি মিথ্যা পোস্ট হয়তো কারও জন্য কয়েক মিনিটের বিনোদন, কিন্তু একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য সেটিই হতে পারে সারা জীবনের সঞ্চয়ের বড় ক্ষতির কারণ।