ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহার ৬-৯ শতাংশ কার্যকর থাকায় গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করে যে, ব্যাংকঋণের সুদহার বাজার নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন ঘোষণার পর ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদহার বাড়ানো শুরু করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক ৫ বছরে টাকা দ্বিগুণ ফেরত দেওয়ার শর্তে আমানত গ্রহণ শুরু করছে। ফলে ঋণের সুদহারও ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
হঠাৎ সুদহার এত বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন গাড়ি-বাড়ির জন্য ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের পাশাপাশি বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। সামনে সুদহার বেড়ে কোথায় যাবে, তা বলতে পারছেন না ব্যাংকাররাও। ব্যাংকভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ও খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক মানুষ যখন সুদহার ছিল ৯ শতাংশ ছিল তখন ঋণ নিয়ে বিভিন্ন কাজে লাগিয়েছেন সেই সব মানুষ ঋণের কিস্তি বৃদ্ধির কারণে নিদারুণ কষ্টে আছেন ।
ব্যাংকগুলো সাধারণত সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনা কমিটি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সুদহার নির্ধারণ করে থাকে। যেসব ব্যাংক তারল্য সংকটে থাকে, তারা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে। আবার সামনে সুদহার আরও বাড়তে পারে-এই আশঙ্কায় ভালো ব্যাংকও উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করে থাকে। তবে প্রতিটি ব্যাংক কিছু আমানত উচ্চ সুদে গ্রহণ করে, আবার কিছু আমানতে সুদহার হয় অন্য ব্যাংকের মতোই। ঋণের ক্ষেত্রেও গ্রাহকভেদে সুদ কম-বেশি হয়।
এবি ব্যাংক সাড়ে পাঁচ বছরে টাকা দ্বিগুণ করার শর্তে আমানত সংগ্রহ করছে। ব্যাংকটির ঋণের সুদহার এখন সাড়ে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত।
আল আরাফা ইসলামি ব্যাংক পাঁচ বছর ছয় মাসে টাকা দ্বিগুণ করার শর্তে আমানত সংগ্রহ করছে। ব্যাংকটির ঋণের সুদহার এখন সাড়ে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।
ন্যাশনাল ব্যাংক এখন ৫ বছর ৬ মাসে দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমানত নিচ্ছে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ছয় বছরে টাকা দ্বিগুণ করার শর্তে আমানত সংগ্রহ করছে। ব্যাংকটির ঋণের সুদ বেড়ে হয়েছে ১৪ শতাংশ।
আইএফআইসি ব্যাংকে আমানতের সুদ ১০ শতাংশে উঠেছে, ঋণের সুদ উঠেছে ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক সাড়ে পাঁচ বছরে টাকা দ্বিগুণ করার শর্তে আমানত নিচ্ছে। তাদের ঋণের সুদ বেড়ে হয়েছে ১৪ শতাংশ।
যমুনা ব্যাংকে আমানতের সুদহার ১০.৪০ শতাংশে উঠেছে, ঋণের ক্ষেত্রে সুদ নিচ্ছে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত।
এনআরবি ব্যাংক পাঁচ বছরে টাকা দ্বিগুণের শর্তে আমানত সংগ্রহ করছে।
মধুমতি ব্যাংকও ছয় বছরে টাকা দ্বিগুণ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে আমানত নিচ্ছে। মধুমতি ব্যাংকের ঋণের সুদ বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত।
সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড ছয় বছরের জন্য টাকা জমা রাখলে ১২.২৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।
এছারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি, আইপিডিসি ও লংকাবাংলার মত প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলিও উচ্চ হারে সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড এক বছর মেয়াদি আমানতে ১১ শতাংশ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড এক বছর মেয়াদি আমানতে ১১ শতাংশ, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড ১১.২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে টাকা জমা নিচ্ছে।
কীভাবে জানবেন কোন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার
দেশের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আছে, প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে তাদের নিয়মিত সুদহারের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। আপনি চাইলে নিকটস্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখাতেও খোঁজ নিতে পারেন। তাতেও মিলতে পারে বাড়তি সুদের খোঁজ।
বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যাংকারদের সাথে আলাপকালে তাঁরা জানালেন ,একটি ব্যাংক সব আমানত বেশি সুদে নেয়না। আমানতের বিভিন্ন স্কিম কিছু হয় বেশি সুদের, কিছু কম সুদের। এভাবে ভারসাম্য করে যারা প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা করতে পারে, সেই প্রতিষ্ঠানই ভালো। সাধারণত যাদের কম সুদের আমানত বেশি, তারা ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
ব্যাংকাররা আরও জানালেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন উচ্চ সুদে টাকা ধার করছে। এ জন্য ব্যাংকের সুদও বেড়ে যাচ্ছে। আবার ব্যাংকের ঋণ আদায় কমে গেছে। ডলারের কারণে টাকারও সংকট চলছে। সরকারি আমানতও এখন সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে কোনো কোনো ব্যাংক কিছু পণ্যে উচ্চ সুদে টাকা ধার করছে।
চলতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক সভায় জানিয়েছেন, বর্তমান তহবিল খরচ বিবেচনায় সুদের হার ১৪ শতাংশের নিচে থাকবে বলে তিনি আশা করেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) নেতারা ১৬ মে এক বৈঠকে সুদহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এ মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্মার্ট (ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের চলমান গড় হার) পদ্ধতিতে সুদহার নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করে। এতে সুদহার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। মূল্যস্ফীতি না কমায় স্মার্ট পদ্ধতি তুলে দিয়ে সুদহার বাজারভিত্তিক করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।