অর্থ লিপি

২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

শিশুকে বড় করা সহজ, বৃদ্ধ মা-বাবাকে শেষ বয়সে আগলে রাখা কেন এত কঠিন?

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

শিশুকে বড় করা সহজ, বৃদ্ধ মা-বাবাকে শেষ বয়সে আগলে রাখা কেন এত কঠিন?

অর্থলিপি | সচেতনতামূলক বিশেষ নিবন্ধ

একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার পর তাকে ঘিরে শুরু হয় ভালোবাসা, যত্ন আর দায়িত্বের এক দীর্ঘ যাত্রা। শিশুর কান্নায় মা-বাবা ছুটে যান, নিজের হাতে খাওয়ান, অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকেন, হাঁটতে না পারলে কোলে তুলে নেন। ধীরে ধীরে সেই শিশু বড় হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং একসময় স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

কিন্তু জীবনের আরেক প্রান্তে এসে গল্পটা যেন উল্টো হয়ে যায়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মা-বাবার শরীর দুর্বল হতে থাকে। চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়, নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। অনেকেই একসময় বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য সন্তান বা অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে যান।

এখানেই শুরু হয় একটি পরিবারের জন্য কঠিন বাস্তবতার অধ্যায়।

শিশুর যত্ন আর বৃদ্ধের পরিচর্যা এক নয়

একটি শিশুকে কোলে নেওয়া, খাওয়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কিংবা রাতে ঘুম পাড়ানো যতটা স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়, একজন অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষের একই ধরনের পরিচর্যা অনেক সময় ততটা সহজ হয় না।

একজন শয্যাশায়ী বৃদ্ধকে বিছানা থেকে ওঠানো, গোসল করানো, কাপড় পরিবর্তন করা, খাবার খাওয়ানো, শৌচাগারে নিয়ে যাওয়া, নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো কিংবা রাতের পর রাত পাশে থাকা শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমের।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বয়সজনিত মানসিক পরিবর্তন। অনেক সময় তাঁরা একই কথা বারবার বলেন, ছোট বিষয়েও বিরক্ত হন কিংবা আচরণে পরিবর্তন আসে। এসব পরিস্থিতি ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে সামলানো পরিবারের সদস্যদের জন্য বড় একটি দায়িত্ব।

তবে এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন।

আজ যিনি আমাদের ওপর নির্ভরশীল, একসময় আমরাই তাঁর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলাম।

শিশুর নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতের, বৃদ্ধের নির্ভরশীলতা অতীতের ঋণের

শিশুর নির্ভরশীলতা আমাদের কাছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। আমরা জানি, আজকের অসহায় শিশুটি একদিন বড় হবে, নিজের জীবন গড়ে তুলবে।

অন্যদিকে একজন বৃদ্ধ মানুষের নির্ভরশীলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের শেষ অধ্যায়ের কথা।

কিন্তু সেই শেষ অধ্যায়টিই হওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা, সম্মান ও মমতায় পূর্ণ।

কারণ মা-বাবা শুধু আমাদের জন্ম দেননি। তাঁরা নিজেদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, শ্রম, স্বপ্ন ও সামর্থ্য আমাদের পেছনে ব্যয় করেছেন।

তাই তাঁদের জীবনের শেষ সময়ে পাশে থাকা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের মানবিকতারও পরিচয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগ বনাম বাস্তব জীবনের দায়িত্ব

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-বাবাকে নিয়ে আবেগঘন লেখা, ছবি কিংবা ভিডিও নিয়মিত দেখা যায়। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট নয়।

বাস্তবে তাঁদের পাশে থাকা।

অসুস্থতার সময়ে সময় দেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, ধৈর্য ধরে কথা শোনা, তাঁদের ছোট ছোট প্রয়োজনের দিকে নজর দেওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তাঁদের যেন বোঝা মনে না হয়, সেটিই প্রকৃত ভালোবাসা।

একজন বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য সন্তানের কয়েক ঘণ্টার উপস্থিতি অনেক সময় দামি উপহারের চেয়েও বেশি মূল্যবান।

পরিচর্যাকারীরও প্রয়োজন যত্ন ও মানসিক সমর্থন

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আমাদের মনে রাখা দরকার।

একজন অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষের পরিচর্যা করতে গিয়ে সন্তানেরাও অনেক সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের পরিচর্যা, কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আর্থিক ব্যয়ের কারণে অনেকেই মানসিক চাপে থাকেন।

তাই পরিবারে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।

একজনের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

কারণ বৃদ্ধ মা-বাবার যত্ন একটি ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি পুরো পরিবারের দায়িত্ব।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি উপলব্ধি

আমার নিজের মা-বাবার জীবনের শেষ বয়সে তাঁদের পরিচর্যা করার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই উপলব্ধি করেছি, বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে আবেগঘন কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তবে একজন অসুস্থ বা শয্যাশায়ী মানুষের প্রতিদিনের সেবা করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

কখনো শারীরিক ক্লান্তি আসে, কখনো মানসিক চাপ তৈরি হয়। কখনো মনে হয় আর পারছি না।

তবুও তাঁদের দিকে তাকালে মনে পড়ে যায়, একসময় তাঁরাই তো আমাদের জন্য সবকিছু করেছেন।

তখন নিজের কষ্টটাকে আর এত বড় মনে হয় না।

শেষ বয়সে মানুষটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কী?

বৃদ্ধ বয়সে একজন মানুষের চিকিৎসা প্রয়োজন, ওষুধ প্রয়োজন, পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও কিছু প্রয়োজন, যা কোনো প্রেসক্রিপশনে লেখা থাকে না।

প্রয়োজন—

ভালোবাসা।
সম্মান।
ধৈর্য।
সময়।
নিরাপত্তা।
আর একজন আপন মানুষের পাশে থাকা।

অনেক সময় বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের কাছে অর্থ চান না। তাঁরা শুধু চান কেউ তাঁদের সঙ্গে কয়েক মিনিট বসুক, কথা বলুক, তাঁদের কথা শুনুক।

এই সামান্য সময়টুকুই হয়তো তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওয়া।

আজই ভাবার সময়

আমরা সবাই কোনো না কোনো সময়ে বৃদ্ধ হব।

আজ যেভাবে আমরা আমাদের মা-বাবার সঙ্গে আচরণ করছি, ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের সন্তানরাও আমাদের কাছ থেকে তেমন আচরণই শিখবে।

তাই বৃদ্ধ মা-বাবার যত্নকে বোঝা হিসেবে নয়, জীবনের একটি স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তাঁদের সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলুন।
সময় দিন।
চিকিৎসার খোঁজ রাখুন।
তাঁদের একাকিত্ব বুঝতে চেষ্টা করুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের অনুভব করতে দিন যে তাঁরা পরিবারের কাছে এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

মা-বাবার জীবনের শেষ অধ্যায়টি হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হতে পারে। কিন্তু সেই কঠিন সময়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

জীবনের শুরুতে তাঁরা আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের হাত ধরে হাঁটানোই হয়তো সন্তানের সবচেয়ে সুন্দর দায়িত্ব।

আল্লাহ যেন কোনো মা-বাবাকে দীর্ঘ অসুস্থতার কষ্ট না দেন। আর যদি এমন পরিস্থিতি আসে, তাহলে তাঁদের সন্তানদের ধৈর্য, শক্তি, সামর্থ্য ও ভালোবাসা দিয়ে সেবা করার তৌফিক দান করেন।

মা-বাবা যতদিন আছেন, তাঁদের সময় দিন।
কারণ চলে যাওয়ার পর ভালোবাসা প্রকাশ করার সুযোগ থাকে, কিন্তু পাশে থাকার সুযোগ থাকে না।

সচেতন হোক পরিবার, মানবিক হোক সমাজ।

Author

  • মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।

    View all posts
Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।