সারাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। প্রতিদিন কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গত আগস্টের শুরুতে সরকার বদলের পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ও কাঁচাবাজারগুলোতে চাঁদাবাজি অনেকটা কমে আসে। এতে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে ভেবেছিল ভোক্তারা। কিন্তু পণ্যের দাম না কমে উল্টো বেড়েছে।
অতি প্রয়োজনীয় চাল, মাছ, মাংস, ডিম ও সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে থাকছে না। জুলাই থেকে অক্টোবরে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে, আমদানি শুল্ক কমিয়ে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে সরকারের চেষ্টা যে খুব বেশি কার্যকর নয়, তা ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্তর বেশ ভালোভাবেই জানান দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফেরানোর আহ্বান ভোক্তাদের।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভয়াবহ বন্যার প্রভাবে পোলট্রি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় বাজারে মুরগি, ডিম ও সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি বেড়েছে। এতে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহের ঘাটতি না থাকলেও বাজারে নজরদারি কম থাকায় ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে নানা অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গত জুলাই ও অক্টোবর বাজারদর ও রাজধানীর মিরপুরের ৩ টি বাজারের দর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত জুলাইয়ের তুলনায় অক্টোবরের খুচরা পর্যায়ে মোটা চাল ও ২৮ চাল প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১১ শতাংশ দাম বেড়ে মানভেদে ৬২ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়ে ১৬০/১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় উঠেছে। বাজারে মাছের সংকট না থাকলেও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে আকার ভেদে রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে এখন সব ধরনের সবজির দাম চড়া। গত জুলাই মাসের তুলনায় অক্টোবরে মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়ে ৯০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বেড়ে রাজধানীর খুচরা বাজারে ঢেরশ, করলা, চিচিঙ্গা, কাকরুল ও বরবটির মতো সবজিও এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার নিচে মিলছে না।
আজ শনিবার (৫ অক্টোবর) মিরপুরের বেশ কিছু বাজারে পাইকারি ও খুচরা দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অনেক তথ্য। একজন ক্রেতার সঙ্গে কথা হয় কাঁচাবাজারে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমাদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সংসারের খরচ নানা ভাবে কমিয়েও ব্যয় সামাল দিতে পারছি না। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তারা প্রথমেই বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে কাজ করবে। কিন্তু বাজারগুলো আগের মতোই চলছে, কোনো রকম মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এতে আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষ আরো চাপে পড়ছে। ব্যায়ের বিপরীতে আয় না বাড়ায় এখন দেশের সীমিত আয়ের বেশির ভাগ মানুষ এমন কষ্টে আছে।
শাক সবজির বাজারেও দাম নিয়ে সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। বাজারে আসা লোকজন বাজার দরনিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কথা বলেন, কেউ কেউ একা একাই কথা বলেন। শাক সবজির দাম চড়া,মাছ–মাংস থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম চড়া। এমন হলে আমরা নিন্মবিত্ত,মধ্যবিত্তরা কোথায় যাব বলে একা একা কথা বলতে দেখা যায় বাজারে আসা বিভিন্নরকম ক্রেতাদের।
সরকারের বেঁধে দেওয়া ডিম ও মুরগির নতুন দর সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন প্রবীন ব্যক্তি বলেন বাজারে সরকারের দেয়া নতুন দর মানছে না কেউ। বাজারে জিনিসপত্রের সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি। একেকদিন এক এক রকমের বাড়তি দাম।
সরকারের বেঁধে দেওয়া নতুন দর সম্পর্কে জানতে চাইলে কালশী বাজারের একজন বিক্রেতা জানান, আমি বেশি দামে কিনে কমে কিভাবে বিক্রি করবো? জিনিসপত্রের দাম বেশি রেখেছেন কেন– এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সঠিক দামেই আমরা বিক্রি করছি। আপনার কেনা লাগলে কিনবেন, নয়তো কিনবেন না। আমরা তো লস করে মাল বিক্রি করবো না।
সরকারের বেঁধে দেওয়া নতুন দর সম্পর্কে জানতে চাইলে মিরপুর ১১ নাম্বারের বাজারের অন্য একজন বিক্রেতা বলেন, সরকার বলেই শেষ, আমাদের নিয়ে না লিখে সিন্ডিকেট নিয়ে লিখেন, মোকামে দাম কমলে আমরা কম দামে বেচব।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, ‘দেশে ডিমের চাহিদা আছে দৈনিক চার কোটি পিস। উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি। কিন্তু বন্যার কারণে বিভিন্ন জেলার খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ লাখ ডিম কম উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় ডিমের দাম বেড়ে গেছে’।
তিনি আরো বলেন, ‘কম মূল্যে মুরগি ও ডিম পেতে হলে পোল্ট্রি খাদ্য ও মুরগির বাচ্চার দাম কমাতে হবে। কারণ আমাদের ডিমের উৎপাদন খরচ ১০.২৯ টাকা , কিন্তু ভারতে ডিমের উৎপাদন খরচ মাত্র পাঁচ টাকা। এখানে উৎপাদন খরচকেই বাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এটা সমাধান করতে হলে বড় বড় সিন্ডিকেট ও করপোরেট গ্রুপগুলোকে ধরতে হবে।
‘দেশীয় পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি নামিয়ে আনা যাবে না। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের খাদ্যশস্যের উৎপাদন খুব বেশি বাড়েনি। যে পণ্যের ঘাটতি থাকবে, সেই পণ্য দ্রুত আমদানি বাড়িয়ে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। সরকার যে খাদ্যশস্যের মজুদ রাখে সেই মজুদ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করতে হবে। যখনই বাজারে ধান-চালের দাম বেড়ে যাবে, তখনই প্রয়োজন অনুযায়ী ছাড়তে হবে।’
বর্তমান বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্তদের জীবনে নাভিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। বাজার করতে আসা বেশ কয়েকজন মধ্যবিত্ত ক্রেতা বলেছেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। অনেকে বলেছেন, ‘আমরা সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। বাজারে জিনিসপত্রের এত দাম যে স্বাভাবিক জীবন নির্বাহ করাই দায় হয়ে পড়েছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য মধ্যবিত্তদের দ্রব্যমূল্য নিয়ে এত হতাশ হতে দেখা যায় নি আগে কখনো।