ঋণের জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির নতুন নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ১ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণের জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে থেকে অনুমতি নিতে হবে। গতকাল (২৮ নভেম্বর )মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা জারি করে সব তপসিলি ব্যাংক এবং জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের পাঠানো হয়েছে।
নীতিমালা সংক্রান্ত সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩ এরমাধ্যমে ধারা ২৯ক সংযোজন করা হয়েছে। ধারার উদ্দেশ্য পূরণ করতে কোনো ব্যাংকের ঋণ(ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ) গ্রহীতা কর্তৃক গৃহীত বা গৃহীতব্য ঋণেরবিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়নের জন্য যোগ্য জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানবাংলাদেশ ব্যাংকে তালিকাভুক্ত হতে হবে।
ঋণঝুঁকি প্রশমনে ব্যাংক কর্তৃক ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে সাধারণত স্থাবর সম্পত্তি যথা জমিও ইমারত এবং অস্থাবর সম্পত্তি তথা মেশিনারিজ, সহজে বিপণনযোগ্য দ্রব্যাদি প্রভৃতিজামানত হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ঋণ শৃঙ্খলাবজায় রাখা, খেলাপি ঋণ আদায়, অবলোপন, নন ব্যাংকিং সম্পদ অন্তর্ভুক্তিকরণ, ঋণপুনঃ তপসিলিকরণসহ শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে রক্ষিতব্য প্রভিশন সঠিকভাবে হিসাবায়নইত্যাদি প্রয়োজনে ঋণের বিপরীতে গৃহীত জামানতের যথাযথ ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নজরুরি। যথাযথ ও নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন নিশ্চিতকরণের জন্য যোগ্য জামানত মূল্যায়নকারীপ্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যূনতম যোগ্যতা ও উপযুক্ততা নির্ধারণ সাপেক্ষে তালিকাভুক্তি এবংতালিকা প্রকাশ অত্যাবশ্যক। কোনো ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা কর্তৃক গৃহীত বা গৃহীতব্য ঋণেরবিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়নের জন্য যোগ্য জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেএকটি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে তালিকাভুক্তির জন্যএ নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো।
নীতিমালা জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্পর্কে বলাহয়েছে, তালিকাভুক্তির আবেদন দাখিল করার সময় প্রতিষ্ঠানের প্রধান মূল্যায়কের সর্বোচ্চবয়সসীমা হতে হবে ৭৫ বছর। বাংলাদেশ সার্ভে অ্যান্ড ভ্যালুয়েশন কোম্পানিজ, ফার্মসঅ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল কন্সার্নস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসভিসিএফআইসিএ); বাংলাদেশইনস্যুরেন্স সার্ভেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন; অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় সমজাতীয়স্বীকৃত কোনো পেশাজীবী সংগঠন বা ইনস্টিটিউশন বা অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ন্যূনতমএকটির সদস্যপদ থাকতে হবে।
সংগঠনের সদস্য ছাড়াও ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশ এবংইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশের সদস্য এসার্কুলারে উল্লিখিত শর্তসমূহ পূরণ সাপেক্ষে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে; ব্যাংক/ আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ সরকারি প্রতিষ্ঠান/ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি/ মাল্টিন্যাশনালকোম্পানিতে জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সার্ভে/ ভ্যালুয়েশন কাজে ন্যূনতম তিনবছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে; জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেতালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানাধীন, অংশীদারি বা লিমিটেড কোম্পানি হিসেবেবিদ্যমান আইনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন থাকতে হবে/ জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানেদক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল (হিসাবরক্ষক, পুরপ্রকৌশলী, যন্ত্রপ্রকৌশলী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীইত্যাদি—প্রয়োজন অনুসারে) এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার থাকতে হবে/ মূল্যায়ন কাজেপ্রতিষ্ঠানের আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা থাকতে হবে।
জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্তিতে কতিপয় অধিকতর যোগ্যতাঅগ্রাধিকার প্রাপ্তির জন্য বিবেচিত হবে। তবে উক্ত যোগ্যতা ব্যতিরেকেও কোনো প্রতিষ্ঠানতালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। যেমন—প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কাজে নতুনপ্রযুক্তি আত্তীকরণের সক্ষমতা।
জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী জনবলের মধ্যে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টঅ্যাকাউন্ট (সিএমএ), চাটার্ড একাউন্টেন্ট (সিএ, এসিসিএ), চাটার্ড ফাইন্যান্সিয়ালঅ্যানালিস্ট (সিএফএ), চাটার্ড জেনারেল অ্যাকাউন্টেন্ট (সিজিএ), চাটার্ড গ্লোবালম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট (সিজিএমএ), চাটার্ড অ্যাকাউন্টিং টেকনিশিয়ান (সিএটি), সার্টিফাইড ভ্যালুয়েশন অ্যানালিস্ট (সিভিএ) ফাইন্যান্সিয়াল মডেলিং অ্যান্ড ভ্যালুয়েশনঅ্যানালিস্ট (এফএমভিএ) ইত্যাদি প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীর অন্তর্ভুক্তি থাকতে হবে। ন্যূনতমতিনটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্তথাকা। প্রধান মূল্যায়ক/সার্ভেয়ারের সংশ্লিষ্ট কাজে পাঁচ বছর বা তার অধিক সময়েরঅভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
আর্থিক খাতের বিভিন্ন বিশ্লেষকদের মতে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে ঋণখেলাপী বহুলাংশে কমে আসবে।তারা আরও জানান ইতিমধ্যেই যারা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ঋণ নিয়েছে সেই টাকা কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।কেউ ঋণ করে ইচ্ছা করে ঋণখেলাপী হলে শাস্তির আওতাধীন করতে হবে।দেশে একটি রেওয়াজ হয়ে গেছে যেন ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিতে হয়না।এই ধারাটি কঠোরভাবে দমন করতে হবে।