বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এমন বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে, যেখানে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের (স্পন্সর/ডিরেক্টর) শেয়ারধারণের হার উল্লেখযোগ্য। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ বেশি থাকে, সেসব কোম্পানির ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা, করপোরেট সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকে এসব শেয়ার।
জুন মাসে প্রকাশিত শেয়ারহোল্ডিং তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের পুঁজিবাজারে অন্তত ৫৫টি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের মালিকানা কাঠামো কোম্পানির প্রতি উদ্যোক্তাদের আস্থা ও দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, করপোরেট সুশাসন, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ আর্থিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে পরিচালনা পর্ষদও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে তুলনামূলক বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে।
বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য
স্পন্সর শেয়ারধারণের তালিকার শীর্ষে রয়েছে বহুজাতিক ও দেশের কয়েকটি সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানি।
সবচেয়ে বেশি স্পন্সর শেয়ার রয়েছে ইউনিলিভার কনসিউমার কেয়ার লিমিটেড (UNILEVERCL)-এ, যেখানে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৯২.৮১ শতাংশ শেয়ার।
এরপর রয়েছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন (UPGDCL), মারিকো বাংলাদেশ (MARICO), গ্রামীণফোন (GP) এবং রবি আজিয়াটা (ROBI)। প্রতিটি কোম্পানিতেই স্পন্সরদের শেয়ারধারণের হার ৯০ শতাংশ।
এ ছাড়া বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ (BERGERPBL)-এ স্পন্সরদের শেয়ার ৮৯.৭৬ শতাংশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংক (DUTCHBANGL)-এ ৮৩.৫৬ শতাংশ, রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ (RECKITTBEN)-এ ৮২.৯৬ শতাংশ এবং জেএমআই সিরিঞ্জেস অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস (JMISMDL)-এ ৭৯.৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATBC)-এ স্পন্সরদের শেয়ার রয়েছে ৭২.৯১ শতাংশ এবং বাটা শু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড (BATASHOE)-এ রয়েছে ৭০ শতাংশ।
উল্লেখযোগ্য কোম্পানির তালিকায় কারা?
স্পন্সরদের উচ্চ শেয়ারধারণের তালিকায় থাকা অধিকাংশ কোম্পানিই ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত। তবে ‘বি’, ‘জেড’ এবং এসএমই প্ল্যাটফর্মের কয়েকটি কোম্পানিও রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য কোম্পানির মধ্যে রয়েছে মিডল্যান্ড ব্যাংক, অ্যাম্বি ফার্মাসিউটিক্যালস, এসবিএসি ব্যাংক, আরএকে সিরামিকস, বিএসআরএম স্টিল, এমজেএল বাংলাদেশ, রহিম টেক্সটাইল, আইসিবি, ওয়ালটন হাইটেক, এসিআই ফর্মুলেশনস, এনভয় টেক্সটাইল, সামিট পাওয়ার, স্কয়ার টেক্সটাইল, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, ট্রাস্ট ব্যাংক, লিন্ডে বাংলাদেশ, এসপিসিএল এবং চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
কেন নজরে থাকে এসব শেয়ার?
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্পন্সরদের উচ্চ শেয়ারধারণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক রয়েছে।
প্রথমত, উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থাকায় কোম্পানির আর্থিক পারফরম্যান্স, সুনাম এবং শেয়ারের মূল্য ধরে রাখার বিষয়ে তাদের দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
দ্বিতীয়ত, বাজারে ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের পরিমাণ কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিক্রির চাপ বা অস্বাভাবিক সরবরাহের ঝুঁকি সীমিত থাকে।
তৃতীয়ত, শক্তিশালী মৌলভিত্তির অনেক কোম্পানি নিয়মিত নগদ বা স্টক লভ্যাংশ প্রদান করে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু স্পন্সর হোল্ডিং দেখেই বিনিয়োগ নয়
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল স্পন্সরদের উচ্চ শেয়ারধারণের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ‘জেড’ ক্যাটাগরি বা দুর্বল পারফরম্যান্সের কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন, মুনাফার ধারাবাহিকতা, ঋণের পরিমাণ, নগদ প্রবাহ, করপোরেট সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পন্সরদের উচ্চ মালিকানা একটি ইতিবাচক সূচক হলেও এটি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। সফল ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য কোম্পানির মৌলভিত্তি, আয় সক্ষমতা, লভ্যাংশ নীতি, মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।