আন্তর্জাতিক বাজারে গমের বুকিং রেট সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী আটা-ময়দার দাম কমছে না। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন গম বেশি আমদানি হয়েছে। তারপরও সংকটের আগের দরেই আটা-ময়দা বিক্রি করছে মিল গুলো।
চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের সরেজমিন চিত্র বলছে, লাইটারেজ জাহাজ থেকে ক্রেনে করে গমের বস্তা নামানো হচ্ছে। এরপর সেই গম ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন গন্তব্যে। গত ৬ মাসের বেশি সময় ধরে বিরতিহীনভাবে গমের এই সরবরাহ চলছে। অথচ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে গম সংকটের অজুহাত দেখিয়ে আসছেন আটা-ময়দার মিল মালিকেরা।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই ৪৪ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি হয়েছে। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে গম আমদানি হয়েছিল মাত্র ৩৪ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় এই অর্থবছরেই ৯ লাখ ৮৯ হাজার মেট্রিক টন বাড়তি গম আমদানি হয়েছে।
এর মধ্যে বিনা শুল্কের বাল্ক গম ২৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন, আর প্যাকেটজাত গম ১৯ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। শুধুমাত্র প্যাকেট করা গম আমদানিতে ৩১ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা বাল্ক আকারে গম এনে শুল্কহার এড়িয়ে চলছেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ব্যারিস্টার মোঃ বদরুজ্জামান মুন্সি বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে যেহেতু আমদানি বেড়েছে, কাজেই কোনো ধরনের গমের সংকট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করছি। পাশাপাশি বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব থাকা উচিত।
একদিকে গম আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেটও কমে এসেছে সর্বনিম্নে পর্যায়ে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ভালো মানের প্রতি মেট্রিক টন গমের বুকিং রেট ৫০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়। বর্তমানে সেটি ৩৯৫ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। কিন্তু এরপরও আটা ও ময়দার মিল মালিকদের দাপটে কোনো ভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
বাংলাদেশে এখন গমের কোনো সংকট নেই উল্লেখ করে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আলম ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক জাবেদুল আলম বলেন, এখন দেশে যে পরিমাণ গম আছে তাতে আগামী দুই মাস যদি দেশে গম না-ও আসে, তবুও বাজারে গমের ঘাটতি হবে না।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স আনোয়ারা ট্রেডিংয়ের মালিক সুমন কুমার সাহা বলেন, আটা-ময়দার দাম এখন পুরোটাই মিলারদের ওপর নির্ভর করছে। তারা এখন অতিরিক্ত মুনাফা করছে।
দেশের বাজারে বর্তমানে কানাডার গম প্রতি মণ ১ হাজার ৭৮০ টাকা, অষ্ট্রেলিয়ার গম ১ হাজার ৫৭০ টাকা এবং রাশিয়ার গম ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ চলতি বছরের শুরুতে এই গমের দাম প্রতি মণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি ছিল। জানুয়ারিতে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়ার গম প্রতি মণ ছিল যথাক্রমে ২ হাজার টাকা, ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১ হাজার ৯০০ টাকা।
কিন্তু মিলগুলোই প্রতি মণ আটা ২ হাজার টাকা এবং ময়দা ২ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। অর্থাৎ সংকটের আগের দরেই আটা-ময়দা বিক্রি করছে তারা। এ বিষয়ে আটা-ময়দার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন বাজারে গমের দাম কম। তাই মিলাররা যদি ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে আদা-ময়দার দাম একটু কম রাখে তাহলে বেশ ভালো হবে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশে তেল-চিনির পাশাপাশি গম আমদানি করে আটা এবং ময়দা বাজারজাত করছে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপ। আর পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণভার এখন তাদের হাতেই।
দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার আমদানি নির্ভর হওয়ায় এখানে কারসাজি হয় মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে। যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা তেল ও চিনির বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার কোটি টাকা, যা এখন হাতানো হচ্ছে গমের বাজার থেকে। তার পরিমাণ কম হলেও শত কোটি টাকা বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।