ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি, অনিয়ম বন্ধ, বিনিয়োগ শিক্ষা এবং ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের অজানা ভয় কাজ করে। শেয়ারবাজারের কথা উঠলেই অনেকের মুখে একটি প্রচলিত মন্তব্য শোনা যায়, ‘শেয়ারবাজার মানেই জুয়া।’
এই ধারণা শুধু ভুল নয়, দেশের পুঁজিবাজারের বিকাশের পথেও একটি বড় মানসিক বাধা।
শেয়ারবাজার জুয়া নয়। এটি একটি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি কোম্পানি যখন পুঁজিবাজারে আসে, তখন সে শুধু শেয়ার বিক্রি করে না, বরং সাধারণ মানুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মূলধন সংগ্রহ করে। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা সেই ব্যবসার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পান।
অবশ্যই এখানে ঝুঁকি আছে। কিন্তু ঝুঁকি আর জুয়া এক বিষয় নয়। জ্ঞান, তথ্য, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ভয় দূর করতে দরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই মানুষের মন থেকে শেয়ারবাজার নিয়ে অযথা ভয় দূর করতে হবে।
এ দায়িত্ব শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং বাজারসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বিনিয়োগ শিক্ষা সভা, সেমিনার, কর্মশালা ও টক শো আয়োজন করা যেতে পারে। মানুষকে বোঝাতে হবে, শেয়ারবাজার কীভাবে কাজ করে, একটি কোম্পানি কীভাবে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, বিনিয়োগের ঝুঁকি কোথায় এবং একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে কী কী বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
শুধু “বিনিয়োগ করুন” বললে হবে না। মানুষকে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে শেখাতে হবে।
ভালো কোম্পানি আনতে হবে বাজারে
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শক্তিশালী কোম্পানি।
দেশের ভালো দেশীয় ব্র্যান্ড, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, লাভজনক ব্যবসা এবং যোগ্য বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ ভালো কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের সামনে ভালো বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারের গভীরতা ও আস্থাও বাড়বে।
তবে শুধু তালিকাভুক্তির সংখ্যা বাড়ানো নয়, কোম্পানির গুণগত মান নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে পুঁজিবাজারমুখী হতে হবে
বাংলাদেশের বড় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় একটি অংশ এখনও ব্যাংকনির্ভর। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ তৈরি হয়।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মূলধন। এই জায়গায় পুঁজিবাজার হতে পারে ব্যাংকঋণের একটি কার্যকর বিকল্প।
সরকারের উচিত এমন নীতিগত পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বড় ও যোগ্য কোম্পানিগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করতে আগ্রহী হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাংকঋণ সীমিত করলেই হবে না। পুঁজিবাজারকে আগে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে কোম্পানিগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে ও প্রতিযোগিতামূলক খরচে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
দ্রুত ও স্বচ্ছ তালিকাভুক্তি, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, ভালো করপোরেট সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
অনিয়ম বন্ধ না হলে আস্থা ফিরবে না
পুঁজিবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর সবচেয়ে বড় শর্ত হলো অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
গুজব, কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, অসাধু লেনদেন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো কিংবা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্য প্রকাশ এবং করপোরেট সুশাসনের মান নিশ্চিত করতে হবে।
একজন বিনিয়োগকারী যেন বিশ্বাস করতে পারেন, তিনি যে তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তা নির্ভরযোগ্য এবং বাজারে সবার জন্য নিয়ম একই।
আস্থা ছাড়া কোনো পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।
শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় শক্তি তারল্য
শেয়ারবাজারের একটি বড় সুবিধা হলো তারল্য। ব্যবসা, জমি কিংবা অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করলে অনেক সময় দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তর করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু একটি কার্যকর ও সুশৃঙ্খল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ার তুলনামূলক সহজে কেনাবেচা করা যায়।
তবে এই সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা-বিক্রেতা, স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ এবং সুষ্ঠু লেনদেনের পরিবেশ থাকতে হবে।
তাই শুধু নতুন বিনিয়োগকারী আনার দিকে নজর না দিয়ে বাজারের গভীরতা, তারল্য ও গুণগত মান বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
গুজবনির্ভর ট্রেডিং আর বিনিয়োগ এক নয়
শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন বিনিয়োগের পরিবর্তে গুজব বাজারকে পরিচালনা করে।
কোনো একটি শেয়ারের দাম বাড়ছে দেখে না বুঝে ছুটে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে বিনিয়োগ করা কিংবা দ্রুত লাভের আশায় ঝুঁকি নেওয়া বিনিয়োগের সঠিক পদ্ধতি নয়।
একজন বিনিয়োগকারী যখন একটি কোম্পানির ব্যবসা, আয়, মুনাফা, নগদ প্রবাহ, সম্পদ, ঋণ, ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন, সেটি একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তাই প্রয়োজন গুজবের পরিবর্তে তথ্য, আবেগের পরিবর্তে বিশ্লেষণ এবং স্বল্পমেয়াদি লোভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে লাভবান হবে পুরো অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, শিল্প ও ব্যবসার জন্য তত বেশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজন হবে।
শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সেই চাহিদা পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদে কঠিন। তাই শক্তিশালী পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু বিনিয়োগকারীর লাভ নয়। এর অর্থ হলো:
কোম্পানি পাবে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন,
ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে,
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে,
শিল্পায়ন বাড়বে,
সরকারের ওপর ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপ কমবে,
আর সাধারণ মানুষ ব্যবসার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন।
এখন প্রয়োজন বড় ধরনের সংস্কার ও সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে মানুষের ভয় রাতারাতি দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ।
সরকারকে নীতিগত নেতৃত্ব দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে হতে হবে দক্ষ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে বিনিয়োগ শিক্ষা ও বাজার উন্নয়নে আরও সক্রিয় হতে হবে।
একই সঙ্গে ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে, দুর্বল ও অনিয়মকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুঁজিবাজারকে এমন একটি জায়গায় পরিণত করতে হবে যেখানে ভালো কোম্পানি সহজে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে এবং বিনিয়োগকারীরা আস্থা নিয়ে সেই ব্যবসার অংশীদার হতে পারবেন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু সূচক বা লেনদেনের পরিমাণ নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট।
এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ভালো কোম্পানি আনতে হবে, অনিয়ম বন্ধ করতে হবে, বিনিয়োগ শিক্ষা বাড়াতে হবে, গুজবের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
তখন হয়তো একদিন “শেয়ারবাজার মানেই জুয়া” এই প্রচলিত ধারণাটি মানুষের মুখ থেকে হারিয়ে যাবে।
কারণ সত্য হলো, শেয়ারবাজার জুয়া নয়। শেয়ারবাজার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
আর সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করা শুধু বিনিয়োগকারীর দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কোম্পানি ও বাজারের প্রতিটি অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্ব।