ঋণখেলাপি কমাতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকনির্ভরতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গায় কার্যকর ও শক্তিশালী শেয়ারবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি দেশের শেয়ারবাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়; এটি শিল্পায়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কার্যকর শেয়ারবাজার শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি ইক্যুইটি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করে। এতে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস বাড়ে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ঋণনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমিয়ে একটি অধিক বৈচিত্র্যময় অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশে শেয়ারবাজারকে এখনও অনেকাংশে দৈনিক লেনদেন, সূচকের ওঠানামা কিংবা বাজার পরিস্থিতির আলোকে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
বাস্তবে একটি কার্যকর শেয়ারবাজার শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি দীর্ঘ মেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে ব্যাংকিং খাতে ঋণঝুঁকি ও খেলাপি ঋণের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ঋণখেলাপি কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনীতিতে ব্যাংক ঋণের বিকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন প্রয়োজন
শেয়ারবাজারকে শুধু ‘কেনাবেচার বাজার’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ভালো ও সম্ভাবনাময় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আসতে উৎসাহিত করা, তালিকাভুক্ত ও নতুন কোম্পানির জন্য ইক্যুইটি অর্থায়নের পথ সহজ করা এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং কোম্পানিগুলোর তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা নয়
শিল্পায়ন ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকা অর্থায়নের উৎসকে সীমিত করে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজারকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে পরিপূরক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার থাকলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক ঋণ ও ইক্যুইটি অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সুযোগ পায়। এতে অর্থনীতিতে অর্থায়নের উৎস যেমন বৈচিত্র্যময় হয়, তেমনি শিল্প প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগও বাড়ে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান
শেয়ারবাজারকে শুধু সূচক ও দৈনিক লেনদেনের পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন না করে জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর প্রণোদনা, ইক্যুইটি অর্থায়ন সহজ করা, প্রয়োজনীয় কর ও নীতিগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ এবং সর্বোপরি বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে শিল্পায়নের অর্থায়ন না করে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কার্যকর পুঁজিবাজারকে সমান্তরালভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
কারণ শক্তিশালী শেয়ারবাজার শুধু বিনিয়োগকারীর সম্পদ তৈরির মাধ্যম নয়। এটি শিল্পায়নের অর্থায়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
তাই ঋণখেলাপি কমানোর উদ্যোগকে শুধু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতির অর্থায়ন কাঠামোকেও বৈচিত্র্যময় করা প্রয়োজন। শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কার্যকর শেয়ারবাজার একসঙ্গে গড়ে উঠলে শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি হতে পারে।
এখন সময় শেয়ারবাজারকে শুধু একটি লেনদেনের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।
Author
-
মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।
View all posts