অর্থ লিপি

৭ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ারবাজার কি সত্যিই ‘জুয়া’? জানুন বাস্তবতা, ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

না জেনে শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া’ বা ফটকাবাজার হিসেবে উপস্থাপন না করে প্রয়োজন তথ্য, জ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে সমাজে এখনও নানা ধরনের ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত একটি ধারণা হলো, “শেয়ারবাজার মানেই জুয়া”। আরও কেউ কেউ এটিকে শুধুই ফটকাবাজার বা অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া’ বলার আগে আমরা কি সত্যিই জানি, শেয়ারবাজার কীভাবে কাজ করে, এর উদ্দেশ্য কী এবং একটি দেশের অর্থনীতিতে এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় যারা কখনো শেয়ারবাজারের কাঠামো, কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়া, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ কিংবা বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেননি, তারাও কোনো ধরনের তথ্য বা বিশ্লেষণ ছাড়াই পুরো শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

শেয়ারবাজার কি শুধুই শেয়ার কেনাবেচার জায়গা?

বাস্তবে একটি সুস্থ, স্বচ্ছ ও কার্যকর শেয়ারবাজার একটি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পায়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।

একটি কার্যকর শেয়ারবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে, শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে এবং বিনিয়োগের বিকল্প ক্ষেত্র বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, শেয়ারবাজারের মূল ধারণাটি কোনোভাবেই জুয়া নয়। তবে বাজারে কীভাবে অংশগ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি করে।

ঝুঁকি আছে, অনিয়মও আছে

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে স্বীকার করা জরুরি। শেয়ারবাজার ঝুঁকিমুক্ত নয়।

গুজব, কারসাজি, অতিমূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগ, দুর্বল কোম্পানিতে বিনিয়োগ, অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা অতিরিক্ত লোভ ও আবেগের কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

বাজারে অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা।

কিন্তু বাজারে কিছু অনিয়ম বা ঝুঁকি রয়েছে বলেই পুরো শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

একইভাবে, কোনো একটি কোম্পানির অনিয়মের দায় পুরো তালিকাভুক্ত কোম্পানি খাতের ওপর চাপানোও সঠিক পদ্ধতি নয়।

বিনিয়োগ আর জুয়া এক বিষয় নয়

জুয়া ও বিনিয়োগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যবসা, আয়, সম্পদ, ঋণ, নগদ প্রবাহ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। অন্যদিকে কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ ছাড়াই শুধু দাম বাড়বে এই আশায় অর্থ ঝুঁকিতে ফেলা বিনিয়োগের সুস্থ চর্চা নয়।

তাই কেউ যদি শেয়ারবাজারে না বুঝে, গুজবের ওপর নির্ভর করে বা দ্রুত লাভের আশায় লেনদেন করেন, সেটি তার বিনিয়োগ আচরণের সমস্যা হতে পারে। সেই আচরণকে পুরো শেয়ারবাজারের প্রকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

সমালোচনা হোক, তবে তথ্যের ভিত্তিতে

শেয়ারবাজারের সমালোচনা করার অধিকার সবারই রয়েছে। বরং গঠনমূলক সমালোচনা বাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সমালোচনা হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে।

কারণ একটি আর্থিক বাজার সম্পর্কে ভুল বা অতিরঞ্জিত বার্তা শুধু বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকেই প্রভাবিত করে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট দূর করতে যেমন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

বাজারকে বুঝুন, তারপর মূল্যায়ন করুন

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়ন শুধু সূচক বাড়ানো বা দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, সুশাসনভিত্তিক ও আস্থাশীল বাজারব্যবস্থা।

এর পাশাপাশি সমাজে শেয়ারবাজার সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোও দূর করা প্রয়োজন।

তাই শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া’ বলার আগে প্রশ্ন করা উচিত:

বাজারটি কীভাবে কাজ করে?
কোম্পানিগুলো কেন শেয়ারবাজারে আসে?
বিনিয়োগকারীরা কীভাবে কোম্পানির মালিকানার অংশীদার হন?
ঝুঁকি কোথায় এবং কীভাবে তা মূল্যায়ন করা যায়?
অনিয়ম হলে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা কী?

প্রশ্ন করুন, জানুন, তথ্য যাচাই করুন। তারপর মতামত দিন।

শেয়ারবাজারকে বুঝতে হবে, তারপর মূল্যায়ন করতে হবে।

ভুল তথ্য নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য।
গুজব নয়, প্রয়োজন যাচাই করা তথ্য।
আবেগ নয়, প্রয়োজন সচেতন সিদ্ধান্ত।

কারণ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাজারের সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাজারের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে সমাজে সঠিক ধারণা তৈরি করাও জরুরি।

শেয়ারবাজারকে না জেনে ‘জুয়া’ বলার আগে, আসুন একবার জেনে নিই শেয়ারবাজার আসলে কী।

Author

  • মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।

    View all posts
Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।