দেশের ব্যাংকিং খাত যখন তারল্য সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট, তখন ব্যবসায়িক সফলতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ (SCB)।
যেখানে অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংক মুনাফা করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ব্যাংকটি কেবল গত পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে।
রেকর্ড মুনাফার পরিসংখ্যান:
২০২৫ সালের চিত্র: গত বছর ব্যাংকটি ৩,২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যাদেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি: ২০২১ সালে মুনাফা ছিল ৭৫৮ কোটি টাকা, যা মাত্র চার বছরেকয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ৩,৩০০ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩,২২০ কোটিটাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিগত ৫ বছর: ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট নিট মুনাফার পরিমাণ৯,৬১৩ কোটি টাকা।
সাফল্যের মূল চাবিকাঠি:
সর্বনিম্ন ব্যয়, সর্বোচ্চ আয়
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই বিশাল মুনাফার পেছনে কাজ করেছে তাদের দক্ষ তহবিল ব্যবস্থাপনা।
ন্যূনতম আমানত ব্যয়: আমানত সংগ্রহে ব্যাংকটিকে নাম মাত্র খরচ করতে হচ্ছে।২০২৫ সালে ৪০,৩৯০ কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে তাদের সুদ ব্যয় ছিল মাত্র২৮৮ কোটি টাকা।
বিশাল স্প্রেড: ব্যাংকটির স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান) বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ ৯.৮৪%। যেখানে গড় আমানত সুদ মাত্র ০.৬৩%, সেখানে ঋণের গড় সুদ ১০.৪৭%।
সরকারি বিনিয়োগ:
বেসরকারি খাতে ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকটি সরকারি ট্রেজারি বিল–বন্ডে ১৭,৯৩৪ কোটিটাকা বিনিয়োগ করে ১,৭৯২ কোটি টাকা আয় করেছে।
সংক্ষিপ্ত পোর্টফোলিও, বিশাল রিটার্ন:
মাত্র ১৮টি শাখা এবং একটি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো নিয়ে পরিচালিত এইব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ (৩০,৪২৩ কোটি টাকা) অনেক বড় দেশীয় ব্যাংকেরতুলনায় কম হলেও, তাদের নিট মুনাফা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী নাসের এজাজ বিজয়ের মতে, ১২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবংবিশ্বমানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাই এই প্রতিকূল সময়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।
২০২৫ সালে হাজার কোটি টাকার উপরে মুনাফা করেছে মোট পাঁচটি ব্যাংক।
|
ব্যাংকের নাম |
নিট মুনাফা (কোটি টাকায়) |
|
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ |
৩,২২০ |
|
ব্র্যাক ব্যাংক |
২,২৫১ |
|
সিটি ব্যাংক পিএলসি |
১,৩২৪ |
|
সোনালী ব্যাংক পিএলসি |
১,৩১৩ |
|
পূবালী ব্যাংক |
১,০৯০ |
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পর বাংলাদেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিট মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। বেসরকারি এ ব্যাংকটি গত বছর রেকর্ড ২হাজার ২৫১ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি সিটি ব্যাংক পিএলসি। গত বছর তাদের নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩২৪কোটি টাকা। আর সরকারি খাতের সোনালী ব্যাংক পিএলসি গত বছর ১ হাজার ৩১৩কোটি টাকার নিট মুনাফা দেখিয়েছে। পূবালী ব্যাংক নিট মুনাফা করেছে ১ হাজার ৯০কোটি টাকা।
দেশের এ চারটি ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক নিট মুনাফার দিক থেকে হাজার কোটি টাকার ক্লাব স্পর্শ করতে পারেনি। ৯০০ কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করে এক্ষেত্রে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ডাচ্–বাংলা, প্রাইম ও ইস্টার্ন ব্যাংক।
উচ্চ সুদহারের বাজার পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, তখন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের শক্তিশালী ব্র্যান্ড ইমেজ ব্যবহার করে অল্প সুদে আমানত সংগ্রহ এবং উচ্চ সুদে বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফার রেকর্ড গড়েছে।
এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষতা থাকলে চ্যালেঞ্জিং সময়েও অভাবনীয় সাফল্য সম্ভব।