ডায়াবেটিস রিভার্স করার উপায় :(পর্ব-৩)
এত খাই, তবুও শক্তি নাইঃ
(ক) সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে :
কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিপাক হয়ে গ্লুকোজ হিসেবে রক্তে প্রবেশ করে। রক্তে গ্লুকোজবাড়লে প্যানক্রাস ইনসুলিন সিক্রেট করে। ইনসুলিন এর সহযোগিতায় গ্লুকোজ কোষেপ্রবেশ করে শক্তি উৎপাদনের জন্য। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্লুকোজ লিভার ও মাসলেগ্লাইকোজেন হিসবে জমা হয়। এরপর আরও অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে ইনসুলিন তা ফ্যাটটিস্যুতে টিজি হিসেবে জমা করে। গ্লাইকোজেনকে নরমাল রেফ্রিজারেটর এবং বডি ফ্যাট(টিজি) কে ডিপ ফ্রিজের সাথে তুলনা করা যায়। কয়েক ঘন্টা না খেয়ে থাকলে স্বাভাবিকমানুষের দেহে গ্লাইকোজেন (নরমাল রেফ্রিজারেটর) থেকে শক্তি উৎপাদন করে। ১২–১৮ঘন্টার মধ্যে গ্লাইকোজেন এর ভান্ডার শেষ হয়ে যায়। তখন বডি ফ্যাট (ডিপ ফ্রিজ) থেকেটিজি ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদন করে। ফলে একজন সুস্থ মানুষ এক দিন না খেয়ে থাকলেওশক্তির ঘাটতি হবে না এবং ক্ষুধাও লাগবে না।
(খ) স্থুলতা কিম্বা ডায়াবেটিস কিম্ব প্রি–ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে :
কোষে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বিল্ড–আপ এর কারণে ইনসুলিন কোষের অভ্যন্তরে গ্লুকোজপ্রবেশ করাতে পারে না। ফলে কোষের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত গ্লুকোজ প্রবেশ না করায় দেহেরপ্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন হয় না। কি করুণ অবস্থা – রক্তে গ্লুকোজ এর বন্যা বইছে, অথচকোষে গ্লুকোজ এর ঘাটতি। অন্যদিকে এদের দেহে ইনসুলিন এর মাত্রা খুব হাই থাকায়, বডিফ্যাট ভেঙ্গেও শক্তি উৎপাদন করতে পারে না। কারণ ইনসুলিন ফ্যাট স্টোর করতেসহযোগিতা করে, কিন্তু ফ্যাট ভাঙতে বাঁধা দেয়। শক্তি না পেয়ে ক্ষুধার হরমোন ব্রেইনকেসিগনাল দেয় – আবার খাওয়ার জন্য। তখন মেদভুঁড়ি ও ডায়াবেটিস রোগী পাগল হয়ে যায়খাওয়ার জন্য।

সুস্থ মানুষের দেহে একইসাথে গ্লুকোজ ও ফ্যাট মেটাবলিজম একটিভ থাকে এবং প্রয়োজনঅনুযায়ী একটা থেকে অন্যটায় সুইস করে। কিন্তু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির ফ্যাটমেটাবলিজম বন্ধ থাকে।
খালি খাই–খাই, তবুও শক্তি নাই।
ডায়াবেটিসে ভুল ডায়েট গাইডলাইনঃ
পরামর্শ : অল্প অল্প করে বারবার খান। সকাল ৮ টার মধ্যে নাস্তা, ১১ টার মধ্যে স্ন্যাকস, ১–২ টার মধ্যে দুপুরে খাবার, বিকাল ৫–৬ টায় বিকালের নাস্তা, রাত ৮ টার মধ্যে রাতেরখাবার, ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস দুধ ….
ভুল : এভাবে দিনে ৬ বার বা ৮ বার খেলে বারবার রক্তের গ্লুকোজ বাড়বে এবং ইনসুলিনলেভেলও বাড়বে। এতে দিনদিন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়বে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকমানোর জন্য দরকার আহারের মধ্যে বড় গ্যাপ। সম্পূর্ণ উল্টো পরামর্শে ডায়াবেটিককন্ডিশন ক্রমাগত খারাপ হতে থাকবে।
পরামর্শ : প্রতিদিন একদম সুনির্দিষ্ট সময়ে আহার গ্রহণ করতে হবে। কোন আহারকেই বাদদেয়া যাবে না। এটাকে বলে ডিসিপ্লিন।
ভুল : এতে কী লাভটা হবে? একে ডিসিপ্লিনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে রোগীকে বাধ্য করাহচ্ছে বারবার খেতে। এটা বলা হয় মেডিসিন এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া কমাতে। এই ডিসিপ্লিনেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়তেই থাকবে।
পরামর্শ : ভাতের বদলে রুটি খান। অন্তত ২ বেলা রুটি খান।
ভুল : সাদা রুটির গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (GI) ৭২ এবং লাল রুটির GI ৭১। পক্ষান্তরে ব্রাউনভাতে GI ৬৬ এবং সাদা ভাতের GI ৭২। ১০০ গ্রাম সাদা রুটি রুটিতে ২৬৫ ক্যালরি এবং১০০ গ্রাম লাল রুটিতে ২৪৭ ক্যালরি শক্তি থাকে। পক্ষান্তরে ১০০ গ্রাম সাদা ভাত ১৩০ক্যালরি এবং ১০০ গ্রাম ব্রাউন ভাতে ১১২ ক্যালরি শক্তি থাকে। রুটিতে ভাত অপেক্ষাক্যালরি অনেক বেশি এবং গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স প্রায় একই (ব্রাউন ভাত অপেক্ষা বেশি)।তাহলে রুটি খেলেই কি লাভ হবে? আর সাদা রুটি ও লাল রুটির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যনাই। বরং গমে ক্ষতিকর গ্লুটেন থাকে। সুতরাং ভাতের বদলে রুটি খাওয়ার পরামর্শহাস্যকর।
পরামর্শ : স্ন্যাকস এ চিনিমুক্ত বিস্কুট, টোস্ট, নুডলস, মুড়ি, খই খান।
ভুল : এগুলো সবই রিফাইন কার্বোহাইড্রেট – যা চিনির সমতুল্য। এসব খাবারের কোনপুষ্টিগুণ নাই। সুতরাং এসব অখাদ্য খেয়ে অহেতুক গ্লুকোজ লেভেল বাড়ানোর দরকার কি?
পরামর্শ : শোয়ার আগে এক গ্লাস/কাপ দুধ খান।
ভুল : শোয়ার আগে দুধের ল্যাকটোজ নামক সুগার ডায়াবেটিস রোগীকে কি ফল দিবে? শোয়ার আগে কিছুই খাওয়া উচিত না।

তেল জাতীয় খাবার কম খানঃ
ভুল : হ্যাঁ ডায়াবেটিস রোগীদের ফ্যাট মেটাবলিজম বন্ধ থাকে। সুতরাং তাদের তেল জাতীয়খাবার বেশি বা কম খাওয়া একই কথা। ফ্যাট এডাপটেশন করার পর তেল জাতীয় খাবারবেশি খেলেও সমস্যা নেই।
সারকথা : ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য পরামর্শ দেয়া হয় মূলত মেডিসিন এর প্রতিক্রিয়ারসাথে সমন্বয় রেখে। এই ফুড গাইডলাইন তাদের কোন উপকারে আসে না – অবস্থা দিন দিনখারাপের দিকে যায়। প্রকৃতপক্ষে একজন সুস্থ মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারই ডায়াবেটিসরোগীদের খাবার। তাদের আলাদা ফুড প্ল্যানিং এর দরকার নাই। চিনি, রিফাইনকার্বোহাইড্রেট, প্রসেসড ফুড, জুস, ড্রিংকস ইত্যাদি একজন সুস্থ মানুষ এবং একজনডায়াবেটিস রোগী উভয়ের জন্যই পরিত্যাজ্য।
লিখেছেন
Engr. Shafiqul Islam
পরবর্তী পর্বে মেডিসিনে কি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয়?
মেডিসিন গ্লুকোজ কমায় কিন্তু ডায়াবেটিস বাড়ায় (!) এই বিষয় নিয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করা হবে।