গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক ও লেনদেনে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সপ্তাহজুড়ে ব্যাংক, সাধারণ বীমা ও সিমেন্টসহ কয়েকটি খাতে ইতিবাচক রিটার্নও এসেছে। ফলে দীর্ঘদিনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে গত সপ্তাহের বাজারচিত্রে কিছুটা স্বস্তির আভাস পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এই ধারাবাহিকতা চলতি সপ্তাহেও বজায় থাকবে, এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
তবে দেশের আরেক পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গত সপ্তাহে সূচক ছিল নিম্নমুখী।
১৭ পয়েন্ট বেড়েছে ডিএসইএক্স
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ১৭ পয়েন্ট বা ০.৩১ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৫৩২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে সূচকটির অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে।
একই সময়ে ডিএসইর নির্বাচিত কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ ৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১০১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে এ সূচক ছিল ২ হাজার ৯৫ পয়েন্টে।
শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএসও ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে সূচকটির অবস্থান ছিল ১ হাজার ১০৫ পয়েন্টে।
সপ্তাহের শুরুতে চাপ, শেষদিকে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলমান জ্বালানি সংকট, কোম্পানিগুলোর আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে সপ্তাহের প্রথমার্ধে ডিএসইতে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল।
বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন ও করপোরেট মুনাফায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাজারে ক্রয়ের তুলনায় বিক্রয়চাপ বেশি ছিল। এতে সপ্তাহের শুরুতে সূচকে চাপ লক্ষ্য করা যায়।
তবে পরবর্তী সময়ে বিক্রয়চাপ কিছুটা কমে এলে বাজারে ক্রয়প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের শেষদিকে ডিএসইর প্রধানসহ অন্যান্য সূচকেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
বাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতাই চলতি সপ্তাহ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
১৪৭ কোম্পানির দর বেড়েছে
গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৬টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৭টির শেয়ারদর বেড়েছে, ২১৩টির কমেছে এবং ২৬টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়া ২৫টি সিকিউরিটিজের কোনো লেনদেন হয়নি।
সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর প্রধান সূচকের উত্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও লাফার্জহোলসিমের শেয়ার।
লেনদেনে বস্ত্র খাতের আধিপত্য
খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৫.৭ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে, যা খাতভিত্তিক লেনদেনে সর্বোচ্চ।
১৫.৬ শতাংশ লেনদেন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। ব্যাংক খাতের অংশ ছিল ১১.১ শতাংশ, যা নিয়ে খাতটি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
এছাড়া ওষুধ ও রসায়ন খাত ১০.২ শতাংশ লেনদেন নিয়ে চতুর্থ এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাত ৬.৯ শতাংশ লেনদেন নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে ছিল।
সিমেন্ট খাতে সর্বোচ্চ ইতিবাচক রিটার্ন
গত সপ্তাহে ডিএসইতে খাতভিত্তিক রিটার্নের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১.৭ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে সিমেন্ট খাতে।
এছাড়া সাধারণ বীমা খাতে ১.৫ শতাংশ, ব্যাংক খাতে ১.১ শতাংশ এবং কাগজ খাতে ০.৯ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে।
অন্যদিকে জীবন বীমা খাতে ১.৩ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে। বিবিধ খাত ও মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ১.২ শতাংশ করে, সিরামিক খাতে ১.১ শতাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ০.৯ শতাংশ এবং ভ্রমণ খাতে ০.৭ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে।
সিএসইতে সূচকের পতন
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গত সপ্তাহে সূচক নিম্নমুখী ছিল।
সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই প্রায় ১ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ৭৩৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহ শেষে সূচকটির অবস্থান ছিল ১৪ হাজার ৮৬৭ পয়েন্ট।
একই সময়ে সিএসইর নির্বাচিত কোম্পানির সূচক সিএসসিএক্স ০.৫৭ শতাংশ কমে ৯ হাজার ২২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের সপ্তাহে এ সূচক ছিল ৯ হাজার ৭৩ পয়েন্ট।
সিএসইতে গত সপ্তাহে প্রায় ৯৩ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে লেনদেন হওয়া ৩০২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১০১টির দর বেড়েছে, ১৭৬টির কমেছে এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
চলতি সপ্তাহ ঘিরে প্রত্যাশা
গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচকসহ অন্যান্য সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ইতিবাচক রিটার্ন বাজারে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সপ্তাহের শেষদিকে বিক্রয়চাপ কমে ক্রয়প্রবণতা বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে এক সপ্তাহের সূচক বৃদ্ধি দিয়ে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। চলতি সপ্তাহে বাজারের গতিপথে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, লেনদেনের ধারাবাহিকতা, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফলে গত সপ্তাহের ইতিবাচক প্রবণতা চলতি সপ্তাহে কতটা স্থায়ী হয়, এখন সেদিকেই নজর রাখছেন দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা।