একীভূত হওয়া পাঁচটি শরীয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
একই সঙ্গে বিতর্কিত ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তও জানানো হয়েছে। সরকারের এ দুটি পদক্ষেপকে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও, এখন সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায়ও দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্তের দাবি উঠেছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সাধারণ মানুষের আমানত সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি জানান, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবধারীরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।
এ ছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সারসহ ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত আমানতকারী এবং হজ সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ মানবিক সুবিধা রাখা হয়েছে। ডিপিএস হিসাবের ক্ষেত্রেও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ থাকবে, বাকি অর্থ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করা হবে।
উল্লেখ্য, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে।
এবার শেয়ারহোল্ডারদের ভবিষ্যৎ কী?
অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আমানতকারীদের জন্য সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ইতিবাচক বার্তা দিলেও একই ব্যাংকগুলোর লাখো সাধারণ শেয়ারহোল্ডারের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।
সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট বা অনিয়মের জন্য তারা দায়ী নন। তাই তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব।
বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, একীভূত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর বিপরীতে নির্ধারিত অনুপাতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নতুন শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সম্পন্ন করে দ্রুত ব্যাংকটিকে পুঁজিবাজারের সেকেন্ডারি মার্কেটে তালিকাভুক্ত করা হলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের একটি স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত সমাধান পাবেন।
তাদের মতে, আমানতকারীদের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হলে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
বাতিল হচ্ছে বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা
এদিকে দীর্ঘ বিতর্কের পর ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর বহুল আলোচিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সরকার এ ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনগণের সম্পদ লুটপাটকারীদের কোনো ধরনের সুযোগ দেওয়া হবে না এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার সময় ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। ওই ধারায় রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের আগের শেয়ারধারীদের পুনরায় সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায়ভার গ্রহণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ বিধানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এর মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে যেতে পারে।
আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত সিদ্ধান্ত
বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত, বিতর্কিত ধারা বাতিল এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এই প্রক্রিয়া তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একীভূত ব্যাংকগুলোর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের বিষয়েও একটি সুস্পষ্ট, ন্যায়সঙ্গত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এতে শুধু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থই রক্ষা পাবে না, দেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতেও দীর্ঘমেয়াদে আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।