অর্থ লিপি

২ মে ২০২৬ শনিবার ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

মন্দার গ্রাসে বহুজাতিক কোম্পানি: লোকসানের পাহাড়ে পিষ্ট অধিকাংশ, ব্যতিক্রম শুধু রবি

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমাগত কমতে থাকা বাজার চাহিদার দ্বিমুখী চাপে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো (এমএনসি) দিশেহারা।দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে মুনাফা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালালেও, ২০২৫ সালেও লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি অধিকাংশ কোম্পানি। প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত বছরটি তাদের জন্য ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

দেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ১১টি তাদের হিসাববর্ষ ডিসেম্বর অনুযায়ী নির্ধারণ করে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানি তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

মুনাফায় ধস, রেকর্ডের পর রেকর্ড লোকসান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র তিনটি কোম্পানির মুনাফা কিছুটা বাড়লেও তা আগের বছরের তুলনায় ছিল নগণ্য। চারটি কোম্পানি গত পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের সর্বনিম্ন মুনাফা করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুটি বড় কোম্পানি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানের মুখে পড়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর অধিকাংশ কোম্পানির বিক্রির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। গ্রামীণফোন, বাটা শু, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট এবং লিন্ডে বিডিরমতো বড় চারটি কোম্পানির বিক্রি সরাসরি কমে গেছে।

জ্বালানি ভোগ্যপণ্যের বাজারে বড় প্রভাব ফেলা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মুনাফা ২০২৫ সালে ৬৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৮কোটি টাকা। অথচ ২০২৩সালে তাদের মুনাফা ছিল হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ছিল হাজার৭৫০ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা।

কোম্পানিটি জানায়, ২০২৫ সাল ছিল আর্থসামাজিক ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা ব্যবসায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং কাঁচামালের বাড়তি খরচ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। তাদের প্রধান দুটি সেগমেন্টে বিক্রিও প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে, আরএকে সিরামিকস গত বছর ৩৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যাতাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অথচ ২০২১ সালেও কোম্পানিটি ৯০ কোটি টাকা মুনাফাকরেছিল। বড় ধাক্কা খেয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশও; তারা ২২৩ কোটি টাকা লোকসানকরেছে, যা তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। হাইডেলবার্গ সিমেন্টের মুনাফা ২০২১সালের সর্বোচ্চ ৪৭ কোটি টাকা থেকে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।

টেলিকম ও ভোগ্যপণ্যেও মন্দার ছোঁয়া

দেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৮. শতাংশ কমেছে। কোম্পানিটি এই পতনের জন্য অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুথ্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছে। গ্রামীণফোন জানায়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দিয়েছে, মানুষের আয় কমেছে এবং বাজারে চাহিদা আরও কমে গেছে।

ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার এবং লাফার্জহোলসিম মুনাফায় থাকলেও ২০২৩সালের তুলনায় তাদের মুনাফা যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ১৪ শতাংশ কমেছে। লিন্ডেবিডির মুনাফা কমে ৩৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যদিও ২০২৪ সালে এককালীন সম্পদ বিক্রির কারণে তাদের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৬৪২ কোটি টাকাহয়েছিল।

ব্যতিক্রম শুধুই রবি

এই ভয়াবহ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রবি আজিয়াটা। কোম্পানিটি রেকর্ড মুনাফা করতে পেরেছে। গত বছরে রবি ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৯৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

(নোট: মারিকো এবং বার্জার পেইন্টসের হিসাববর্ষ মার্চে শেষ হওয়ায় এই বিশ্লেষণেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।)

ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বহুবছর যাবত বিনিয়োগ করে এমন একজন ফান্ড ম্যানেজারের মতে , মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর এই পরিস্থিতির মূল কারণহিসেবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলোসেই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপাতে পারেনি। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেযাওয়ায় বাজারে চাহিদাও কমেছে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে শহিদুল ইসলাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “সাম্প্রতিকমাসগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।কয়েক মাস আগে পরিস্থিতির উন্নতির আশা দেখা গেলেও ইরানইসরায়েল যুদ্ধ নতুনঝুঁকি তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, “এখন সবকিছু নির্ভর করছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং তেলেরদামের ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম বাড়লে সামগ্রিক অর্থনৈতিকপরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, যা সরাসরি কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সেপ্রভাব ফেলবে।

সার্বিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট, দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ক্রমহ্রাসমান ভোক্তা চাহিদা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপ তাদের ব্যবসার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিক্রি কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি খরচ বাজারে সমন্বয় করার মতো সক্ষমতা অনেক কোম্পানিরই নেই, ফলে মুনাফা সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও সরাসরি লোকসানে রূপ নিচ্ছে।

২০২৫ সালের আর্থিক ফলাফল তাই কেবল একটি বছরের পারফরম্যান্স নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। অধিকাংশ কোম্পানির জন্য এটি ছিল টিকে থাকার লড়াইয়ের বছর, যেখানে ব্যতিক্রম হিসেবে রবি আজিয়াটা কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে।

তবে সামনে পথ আরও চ্যালেঞ্জিং। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানইসরায়েল সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্বি জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যদি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য পুনরুদ্ধার আরও বিলম্বিত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং বাজার কৌশলে দ্রুত অভিযোজনের দিকে জোর দিতে হবে। অন্যদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হতে পারে এই খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান শর্ত।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।