দেশে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে একীভূত পাঁচ ব্যাংকে আগের মালিকদের কর্তৃত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন আমানতকারীরা।
এতে নতুন করে আবার আমানত তুলে নিতে চাইছেন অনেকে। অনেকেই আবার কোনো মুনাফা ছাড়াই কেবল আসল ফেরত চাইছেন।
এ পরিস্থিতিতে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে কিনা, তা নিয়ে লিখিতভাবে পরিষ্কার বার্তা চান এসব ব্যাংকে নিয়োগ করা প্রশাসকরা।
গতকাল রোববার (২৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকরা চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আলোকে গত বছর শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বছরের নভেম্বরে পাঁচজন প্রশাসক ও তাদের সহযোগিতার জন্য চারজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এ ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, একীভূত ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ দিয়ে আগের মালিকরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। একীভূত হওয়ার আগে এক্সিম ব্যাংকের কর্তৃত্ব ছিল নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। বাকি চার ব্যাংক পরিচালিত হতো এস আলম গ্রুপের কর্তৃত্বে।
জানা গেছে, গতকালের বৈঠকে প্রশাসকরা বলেন, আমানতকারীরা এসব ব্যাংক থেকে বেশ আগে থেকে টাকা তুলতে পারছেন না। তবে একীভূত করে সরকারি মালিকানায় নেওয়ার খবরে তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা না দেওয়ার (হেয়ারকাট) সিদ্ধান্ত জানালে আবার অস্থিরতা তৈরি হয়। পরে অবশ্য ৪ শতাংশ হারে মুনাফার কথা বলায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। কিন্তু ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে ১৮ক ধারা যুক্ত করে আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগে নতুন করে আবার চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখন আবার আমানত তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন। অনেক আমানতকারী শুরুতে দেওয়ার ‘হেয়ারকাট’ মেনে কেবল মূল টাকা ফেরত চাচ্ছেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসকরা আরও জানিয়েছেন, এসব আলোচনার মধ্যে ব্যাংকগুলো নতুন করে আর আমানত পাচ্ছে না। মাঝে যেসব ঋণের টাকা ফেরত আসছিল, তাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই চাপ সামলে আইনে এই ধারা যুক্ত করার মাধ্যমে আসলে কী চাওয়া হচ্ছে– সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। এর মাধ্যমে যদি আগের মালিকদের ফিরিয়ে আনা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে কীভাবে ফেরত আনা হবে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত কীভাবে হবে– এসব পরিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দিকনির্দেশনা দেননি। কেবল বলেছেন, যখন যে পরিস্থিতি আসবে, তা মোকাবিলা করতে হবে।
জানা গেছে, দুর্বল পাঁচ ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ধার হিসেবে ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকা দিয়েছে। এসব ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে সরকার মূলধন হিসেবে দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রত্যেক আমানতকারীকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার জন্য আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা বা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।