মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর নীতিতে চলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের জুলাই মাসে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেয়ার পর দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়েই চলছে।ফেব্রুয়ারির জন্য ব্যাংক ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২.৪৩ শতাংশ। যা গত জানুয়ারিতে ছিল ১১.৮৯ শতাংশ। সে হিসেবে মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে সুদহার বেড়েছে ০.৫৪ শতাংশ। আর গত সাত মাসের হিসাব ধরলে এ সময়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৩.৪৩ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ নির্ধারিত ছিল।
যদিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে সুদহার বাড়ানোর নীতিতে চলছে বাংলাদেশ ব্যাংক।তদুপরি মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS ) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৪১ শতাংশ। যদিও অর্থনীতিবিদদের দাবি, দেশের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার (BBS ) তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি।
সুদহার বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। গতকাল দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে (কলমানি) একদিন মেয়াদি ধারের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল৯.৫০ শতাংশ। সুদহার এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও কলমানি বাজারে প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থ মিলছে না। এজন্য ব্যাংকগুলোকে দৈনন্দিন লেনদেন সম্পন্ন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার বাড়াতে হচ্ছে। যদিও বাজারে অর্থের সরবরাহ কমানোর কথা বলে নীতি সুদহার(রেপো) কয়েক দফায় বাড়িয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোএখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করছে।
তারল্য সংকট তীব্র হওয়ায় সরকারি ট্রেজারি বিল–বন্ডের সুদহারও বাড়ছে। গত সপ্তাহে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার উঠেছে ১১.৩৫ শতাংশে। এর চেয়ে বেশি মেয়াদি সুদের হার আরো বড়। উচ্চ এ সুদেই ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়বে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকেরনির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানিয়েছেন।তিনি বলেন, এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য।মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সরকারি বিল–বন্ডের সুদহার বাড়লে ব্যাংক ঋণের সুদও বাড়বে।
উল্লেখ্য ডলার সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছ থেকে ৪৭০কোটি ডলার ঋণ সহায়তা নিচ্ছে সরকার। দাতা সংস্থাটির ঋণ দেয়ার শর্ত অনুযায়ী, গতবছরের জুলাই থেকে ব্যাংক ঋণের বাজারভিত্তিক সুদহার নির্ধারিত হচ্ছে, যা স্মার্ট বা সিক্সমান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল হিসেবে পরিচিত। প্রতি মাসের শুরুতে এস্মার্ট রেট জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত জুলাইয়ে স্মার্ট রেট ছিল ৭.০১ শতাংশ।এরপর থেকে এ হার ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারির জন্য স্মার্ট রেট ৮.৬৮শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৩.৭৫ শতাংশ সুদ মার্জিনযুক্ত করতে পারবে ব্যাংকগুলো। সে হিসাবে চলতি ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারহবে ১২.৪৩ শতাংশ।
তবে এসএমই ও রিটেইল ঋণের জন্য এর চেয়েও বেশি সুদ গুনতে হবে গ্রাহকদের।ফেব্রুয়ারিতে এ দুই খাতের ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ১৩.৪৩ শতাংশ। কৃষি ও পল্লীঋণের ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ১১.৪৩ শতাংশ হবে। ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সর্বোচ্চ সুদ২০ শতাংশ থাকবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক একজন সভাপতি মনে করেন, তারল্য সংকট অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫–১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেযেতে পারে।তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বিল–বন্ডের সুদহার প্রায় ১২শতাংশে উঠে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যাংক ঋণের সুদহারও বাড়তে থাকবে।ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ ব্যয়ও (আমানতের সুদহার) অনেক বেড়ে গেছে।তিনি বলেন‘ঋণের সুদহার ১৮–২০ শতাংশ থাকার সময় দেশের বেসরকারি খাত সবচেয়ে বেশি বিকশিতহয়েছে। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সুদহার অর্ধেকে নেমে আসার পরবেসরকারি খাত সমৃদ্ধ না হয়ে উল্টো দুর্বল হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণঅস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। আমি মনে করি, যেকোনো ব্যবসার জন্য “ইফিশিয়েন্সি” খুবইগুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত যেকোনো ব্যবসায় সমৃদ্ধি আনতে পারে।
একজন প্রবীণ ব্যাংকার জানান ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়লেও একশ্রেণীর মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে ভয় পাচ্ছেন ।তিনি জানান দেশের ব্যাংকগুলিতে মাত্রাতিরিক্ত ঋণখেলাপীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।এই ধারা বন্ধ করতে হবে কিভাবে ঋণখেলাপীদের নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সে ব্যাপারে কঠোরভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।