টানা দরপতনের পর অবশেষে কিছুটা স্বস্তির দেখা মিলেছে দেশের পুঁজিবাজারে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শুরুতে তীব্র ওঠানামা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ক্রয়চাপ বাড়ায় প্রধান সূচক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৮.৯৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৬৭.৪২ পয়েন্টের ঘরে অবস্থান করছে।
সাম্প্রতিক টানা দরপতনের পর সূচকের এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে এক দিনের এই ঘুরে দাঁড়ানোকে বাজারের স্থায়ী পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন উঠেছে, খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসা এই উত্থান কতটা টেকসই হবে?
দাম কমলে স্বাভাবিক, বাড়লেই সন্দেহ কেন! শেয়ারবাজারে দ্বৈতনীতি বন্ধ হোক
টানা পতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
গত কার্যদিবসে ডিএসইএক্স ১০৩ পয়েন্টের বেশি হারিয়ে ৫,৫৫৮.৪৫ পয়েন্টে নেমে এসেছিল। একই সঙ্গে বাজারে ব্যাপক বিক্রয়চাপ এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর বাজারে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪৫ কোটি টাকা এবং ১ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়।
এর পরদিন সূচকের ঘুরে দাঁড়ানোকে তাই স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বড় পতনের পর কিছু শেয়ারে দর কমে আকর্ষণীয় পর্যায়ে চলে আসায় দরপতনের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা বাজারে কিছুটা ক্রেতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধের বিকল্প নেই
তবে স্বস্তির চেয়ে সতর্কতাই বেশি
সূচক বাড়লেও বাজারের বর্তমান অবস্থাকে এখনো স্বস্তিদায়ক বলা যাচ্ছে না। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ধারাবাহিক পতন, দুর্বল লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ৩ সেপ্টেম্বর ডিএসইএক্স ৫,৬৬২.০৯ পয়েন্টে ছিল। পরবর্তী কার্যদিবসে বড় পতনের পর সূচক নেমে আসে ৫,৫৫৮.৪৫ পয়েন্টে। অর্থাৎ মাত্র এক কার্যদিবসেই বাজারের প্রধান সূচক ১০৩ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে।
এই বাস্তবতায় আজকের প্রায় ৯ পয়েন্টের উত্থান অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু এটি এখনো বড় ধরনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো শক্তিশালী নয়।
টেকসই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন লেনদেন
বাজার বিশ্লেষণে শুধু সূচকের ওঠানামা দেখলেই হবে না। সূচকের সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ, বাজারে অংশগ্রহণ এবং কতটি কোম্পানির দর বাড়ছে বা কমছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের উত্থান যদি বাড়তি লেনদেন ও ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে হয়, তাহলে সেটি বাজারে ক্রেতাদের ফিরে আসার একটি শক্তিশালী সংকেত হতে পারে। বিপরীতে অল্প কিছু বড় মূলধনি শেয়ারের ওপর নির্ভর করে সূচক বাড়লে সেটিকে টেকসই বাজার পুনরুদ্ধার বলা কঠিন।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখন সবচেয়ে বড় বিষয়
বর্তমান বাজারে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন। কারণ বিনিয়োগকারীরা যদি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাহীন থাকেন, তাহলে সূচক সাময়িকভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন বিক্রয়চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আজকের জন্য ডিএসইও বিনিয়োগকারীদের গুজবনির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি, কারিগরি বিশ্লেষণ, মূল্যস্তর এবং প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে।
সামনে বড় পরীক্ষা ৫,৫০০-৫,৬০০ পয়েন্ট অঞ্চল
প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকেও আগামী কয়েকটি কার্যদিবস গুরুত্বপূর্ণ। ৫,৫০০ পয়েন্টের ওপরে সূচক ধরে রাখতে পারা এবং ধীরে ধীরে ৫,৬০০ পয়েন্টের দিকে ফিরে যাওয়া বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হবে।
অন্যদিকে, সূচক আবারও ৫,৫০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেলে সাম্প্রতিক পতনের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তাই আজকের বাজারকে বলা যায় ‘রিলিফ র্যালির’ প্রথম ইঙ্গিত, কিন্তু এখনো নিশ্চিত প্রত্যাবর্তন নয়।
অর্থলিপির বাজার বিশ্লেষণ
খাদের কিনারা থেকে সূচক ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এটি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু টেকসই উত্থানের জন্য এক দিনের সবুজ বাজার যথেষ্ট নয়।
সূচককে ধরে রাখতে হবে, লেনদেন বাড়াতে হবে, মৌলভিত্তিক শেয়ারে ক্রেতা বাড়াতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
আগামী কয়েকটি কার্যদিবসই বলে দেবে, আজকের উত্থান কেবল সাময়িক স্বস্তি, নাকি সত্যিই ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের শুরু।