তিন দিনের অস্ত্রবিরতি সত্ত্বেও সুদানের রাজধানী খার্তুম ও পার্শ্ববর্তী শহরে বিক্ষিপ্ত গোলাবর্ষণ ও গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশটির সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলা লড়াই গতকাল মঙ্গলবার ১১তম দিনে গড়িয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকার খবর দিয়েছেন দেশটির এক রাজনীতিক।
দুই পক্ষের লড়াইয়ে ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী খার্তুম। বিদ্যুৎ ও পানির অভাবে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। অস্ত্রবিরতির সুযোগে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন সুদানের নাগরিকেরাও।
সুদানের বেসামরিক রাজনৈতিক জোট ফোর্সেস ফর ফ্রিডম অ্যান্ড চেঞ্জের (এফএফসি) প্রথম সারির নেতা ইয়াসির আরমান পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল এবং হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর পাঠাতে মানবিক সংগঠনগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়াসির আরমান বলেন, ‘রাস্তায় রাস্তায় মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অসুস্থ লোকজন ওষুধ পাচ্ছেন না। কোনো পানি কিংবা বিদ্যুৎ নেই। অস্ত্রবিরতি চলাকালে লোকজনকে লাশ দাফনের সুযোগ দেওয়া উচিত।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে খার্তুমের একজন বাসিন্দা বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা কমতে থাকলে লড়াইরত বাহিনীগুলো বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি আরও কম শ্রদ্ধা দেখাবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে, খাবার, সুপেয় পানীয়, ওষুধ ও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহও সীমিত। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। বাসিন্দারা বলছেন, মিসরে যাওয়ার বাস টিকিটের দাম ছয় গুণ বেড়ে ৩৪০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
এই লড়াইয়ে ৪২৭ জন নিহত ও ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বলছে। অবশ্য লড়াই অব্যাহত থাকলেও হতাহতের এই পরিসংখ্যান গত দুই দিন একই জায়গায় স্থির রয়েছে।
এর আগে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সুদানে লড়াইরত জেনারেলরা তিন দিনের অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গত সোমবার জানান। তিনি বলেন, ৪৮ ঘণ্টা ধরে নিবিড় আলোচনার পর সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী অস্ত্রবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে। এই অস্ত্রবিরতি অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্থায়ী হবে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সুদানের সামরিক বাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী আরএসএফের মধ্যে ১৫ এপ্রিল লড়াই শুরু হয়। এই সংঘাতের এক পক্ষে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। অপর পক্ষে আরএসএফের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো ওরফে হেমেদতি। সংঘাত থামাতে আগেও একাধিকবার চেষ্টা হয়েছিল। সেসব প্রচেষ্টায় অস্ত্রবিরতি হলেও বেশিক্ষণ টেকেনি। নতুন অস্ত্রবিরতি সত্ত্বেও গতকাল সকালে খার্তুমের পার্শ্ববর্তী শহর ওমদুরমানে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে খার্তুমেও।
সেনাবাহিনী অস্ত্রবিরতি ভেঙে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আরএসএফ। আধা সামরিক বাহিনীটি বলেছে, খার্তুমে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে তাঁদের সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে আরএসএফের বিরুদ্ধে কূটনীতিকদের ওপর হামলার অভিযোগ এনেছে সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দুই পক্ষের মধ্যে লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, সুদান এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। সুদানের সংঘাত পুরো অঞ্চল, এমনকি অঞ্চলটির বাইরের এলাকাকেও গ্রাস করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘সুদানকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে আমাদের সবাইকে সাধ্যের মধ্যে সবকিছু করতে হবে।’ সুদান বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। বৈঠকটি গতকাল হওয়ার কথা ছিল বলে এক কূটনীতিক জানান।
অস্ত্রবিরতির ফলে লড়াই কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসার সুযোগে নিজেদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। গত কয়েক দিনে বিদেশিদের পাশাপাশি কয়েক হাজার সুদানি নাগরিক মিসর, দক্ষিণ সুদান ও শাদে আশ্রয় নিয়েছে বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সুত্র–রয়টার্স