সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে মুনাফা নেয়ার একটা প্রবণতা দেখা গেছে। এইতো এক বছর আগেও ব্যাংকে টাকা জমা রেখে যে সুদ বা মুনাফা মিলতো, তা দিয়ে ব্যাংক হিসাব চালানোর খরচ মেটানোর পর বাড়তি অল্প কিছু অর্থ মিলত। একপর্যায়ে ব্যাংকে গ্রাহকের আমানতের বিপরীতে দেওয়া সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিল। তাতে অনেক গ্রাহক ব্যাংক-বিমুখ হয়ে পড়েছিলেন। মূলত সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহার আটকে রাখায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
গতবছর সুদহারের নির্দিষ্ট সীমা তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে বাড়তে শুরু করেছে ব্যাংকের আমানতের সুদ। কোনো কোনো ব্যাংক তো সঞ্চয়পত্র ও বন্ডের চেয়ে বেশি সুদ দিচ্ছে। ফলে অনেক আমানতকারী আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছেন। আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন যে সুদ দিচ্ছে, তাতে এখনই ব্যাংকে টাকা রাখার উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন আর্থিকখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, পরে এত সুদ না-ও মিলতে পারে। এখন প্রেক্ষাপট ও ব্যাংকের নিজের তাগিদে আমানত নিচ্ছে বেশি সুবিধা দিয়ে।
দেশে চলতি মার্চ মাসে (২০২৪) ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.১১ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারিতেও ব্যাংকে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ছিল ১২.৪৩ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলো এখন আমানতে কম বেশি ১০ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক সাড়ে (৫ বছর ৬ মাসে) পাঁচ বছরে দ্বিগুণ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে টাকা জমা নিচ্ছে।
আবার সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি আমানত নিচ্ছে না। তারা বিশেষ আমানত পণ্য এখন বন্ধ রেখেছে।
আরও পড়ুন…
এক্সিম ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক একীভূত হচ্ছে
ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহারও বেড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণের পাশাপাশি আমানতের সুদহারও বাড়িয়েছে। চলতি মার্চ মাসের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫.৩৬ শতাংশ নিতে এবং আমানতে ১২.৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে পারবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আমানতে এত সুদ সবাই দিচ্ছে না। যাদের বেশি প্রয়োজন তারা দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ব্যাংকগুলোতে টাকা জমা রাখার ক্ষেত্রে নানাবিধ হিসাব রয়েছে। যাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন ও প্রতিদিন লেনদেনের প্রয়োজন হয়, তাঁরা চলতি হিসাব খোলেন। এ ধরনের হিসাবে সুদ সব সময় কম থাকে। এরপর কম সুদ থাকে সঞ্চয়ী হিসাবে। আর ব্যাংকগুলো বেশি সুদ দেয় বিভিন্ন মেয়াদি, স্থায়ী আমানত ও বিভিন্ন স্কিমে।
দেশে ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়ছে। কিন্তু সব ব্যাংকেই কিন্তু বাড়েনি,যারা খোঁজ খবর কম রাখেন তারা জানেনও না কোন ব্যাংকের সুদের হার কেমন। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাংকে ঋণের সুদের হার ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণ আদায়ে মন্দা ও ভাবমূর্তির সংকটের কারণে কিছু ব্যাংক আগে থেকেই তারল্য সংকটে ছিল। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহারও বাড়াতে শুরু করেছে। তারা বাড়তি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছিল। এখন মোটামুটি সব ব্যাংক কম বেশি আমানতের সুদহার বাড়িয়েছে। ফলে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে ভালো মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে তারল্যসংকটে থাকা ব্যাংকগুলো বেপরোয়া ভাবে সঞ্চয়পত্র ও বন্ডের চেয়েও বেশি সুদ দিয়ে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
আরও পড়ুন…
ব্র্যাক ব্যাংকের সাথে গ্রিন ডেলটা মেটলাইফের মধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্স চুক্তি সম্পন্ন
বেসরকারি খাতের আল আরফা ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড (AIBL) ,ন্যাশনাল ব্যাংক (NBL) ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB) এখন ৫ বছর ৬ মাসে দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমানত নিচ্ছে। ব্যাংক ৩ টি এ ধরনের আমানতে ১৩.৪০ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে এক বছরের জন্যও স্থায়ী আমানত হিসাব খোলা যায়। সেগুলো থেকে মাসে মাসে মুনাফা পাওয়ার সুবিধা আছে। এক বছরের স্থায়ী আমানতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB) ১১ শতাংশ এবং আল আরফা ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড (AIBL) ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
চলতি (২০২৪) মার্চ মাসে ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.১১ শতাংশ। যা গতমাস (ফেব্রুয়ারিতে) ব্যাংকে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ছিল ১২.৪৩ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলো এখন আমানতে কম বেশি ১০ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক সাড়ে পাঁচ বছরে দ্বিগুণ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে টাকা জমা নিচ্ছে।
সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড (SIBL) ছয় বছরের জন্য টাকা জমা রাখলে ১২.২৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। আমানতে এ রকম বা এর কাছাকাছি সুদ দিচ্ছে আরও কিছু ব্যাংক।
দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড (I PDC)এক বছর মেয়াদি আমানতে ১১ শতাংশ,আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড (IDLC) এক বছর মেয়াদি আমানতে ১১ শতাংশ, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেড ১১.২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে টাকা জমা নিচ্ছে।
কীভাবে জানবেন কোন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার
দেশের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আছে, প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে তাদের নিয়মিত সুদহারের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। আপনি চাইলে নিকটস্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখাতেও খোঁজ নিতে পারেন। তাতেও মিলতে পারে বাড়তি সুদের খোঁজ।
বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যাংকারদের সাথে আলাপকালে তাঁরা জানালেন ,একটি ব্যাংক সব আমানত বেশি সুদে নেয়না। আমানতের বিভিন্ন স্কিম কিছু হয় বেশি সুদের, কিছু কম সুদের। এভাবে ভারসাম্য করে যারা প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা করতে পারে, সেই প্রতিষ্ঠানই ভালো। সাধারণত যাদের কম সুদের আমানত বেশি, তারা ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
ব্যাংকাররা আরও জানালেন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন উচ্চ সুদে টাকা ধার করছে। এ জন্য ব্যাংকের সুদও বেড়ে যাচ্ছে। আবার ব্যাংকের ঋণ আদায় কমে গেছে। ডলারের কারণে টাকারও সংকট চলছে। সরকারি আমানতও এখন সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে কোনো কোনো ব্যাংক কিছু পণ্যে উচ্চ সুদে টাকা ধার করছে।
আরও পড়ুন…
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক অনুমোদিত মূলধন বাড়াবে
দেশে ব্যাংকের পাশাপাশি মানুষের বিনিয়োগের আরেকটি বড় মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে হয় তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য। মেয়াদ পূর্তির আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হলে সর্বনিম্ন মুনাফা মেলে ৭.৭১ শতাংশ। মেয়াদ ও টাকার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ১১.৭৬ শতাংশ মুনাফা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে যাঁদের এ খাতে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে, তাঁদের মুনাফা কম।
অপরদিকে বর্তমানে বন্ডের সুদহারও বেশি। সরকার সর্বশেষ ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১১.৪০ শতাংশ সুদে টাকা ধার করেছে। দুই বছর মেয়াদি বন্ডের সুদ ১২ শতাংশ, এর বেশি মেয়াদ হলে সুদ আরও বেশি হয়।
ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে পরিচিত একজন আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যত দুর্বল, তার আমানতের সুদ তত বেশি। ফলে সুদ বেশি দেখে টাকা রাখবেন, নাকি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি ও ভাবমূর্তি দেখে টাকা জমা রাখবেন, সেই সিদ্ধান্ত গ্রাহকের নিতে হবে।
বেশ কয়েক জন ব্যাংকারদের সাথে আলাপকালে তারা জানান বর্তমানে অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদে টাকা সংগ্রহ করলেও আশানুরূপ আমানতকারী পাওয়া যাচ্ছেনা। এর কারণ হিসাবে তাঁরা জানালেন , কিছু কিছু ব্যাংক নিয়ে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণখেলাপি বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক খবর পেপার ও মিডিয়ায় আসা, দুর্বল ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সাথে একিভূতিকরণ সহ নানাবিধ কারণে ব্যাংক খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই ব্যাংকের আমানতের সুদ বাড়লেও মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্ক সৃষ্টি হবার কারণে আশানুরূপ আমানত পাচ্ছেনা।
আরও পড়ুন…
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপিদের তথ্য পাঠাবে বিএসইসির কাছে
তিনটি প্রথম সারির বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে তাঁরা জানান সম্প্রতি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতো এমন কিছু কিছু বড় বিনিয়োগকারী ব্যাংকে টাকা আমানত রাখছেন। কেন তারা শেয়ার বাজার ছেড়ে আসলেন এই বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে, তাঁরা জানান সাম্প্রতিক শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে তারা ব্যাংকে নিশ্চিত মুনাফা পাচ্ছেন বলে এখানে আমানত রেখেছেন। তারা আরও জানালেন শেয়ারবাজার থেকে আসা ফান্ডগুলো বেশির ভাগই ১ বছর মেয়াদে আমানত রাখছেন।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সাম্প্রতিক শেয়ার বাজারের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ ব্যাংকের আমানতের সুদ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র বন্ড ও ট্রেজারি বিলের সুদের হার বাড়া।
ব্যাংকের আমানতের সুদ বেড়েছে ,কোন ব্যাংকে বেশি মুনাফাও মিলছে
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।