ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট অনুমোদন করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘সকল নাগরিকের কল্যাণ’ এবং সংকট-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত এই বাজেটকে সরকার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেটটি অনুমোদনের পর সংসদে তা উপস্থাপন করা হয়।
বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য
প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভরতা
বিশাল এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করা হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে।
সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে আসবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দ
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া খাতগুলোর একটি। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে এই বাড়তি বিনিয়োগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সুদ পরিশোধেই বড় ব্যয়
বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হবে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধে। আগামী অর্থবছরে সুদ বাবদ ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা ও সুদ ব্যয়ের চাপকে অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রণোদনার ইঙ্গিত
রপ্তানিমুখী শিল্প ও উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করতে পোশাক শিল্প, প্যাকেজিং খাত এবং শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (AIT) ও উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা এবং কিছু ভোগ্য ও গৃহস্থালি পণ্যে ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ ও প্রতিরক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা এবং প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে এসব খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন।
স্বস্তি নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা। কারণ ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে শিক্ষা, স্টার্টআপ, শিল্পায়ন এবং কিছু ভোগ্যপণ্যে কর-সুবিধার মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য আংশিক স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “এই বাজেট উন্নয়নকে বৈষম্যহীন, কর্মসংস্থানকে নিরাপদ এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতামূলক করার একটি নীতি-পরিকল্পনা। ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর এক ইতিবাচক সূচনা হবে এই বাজেট।”
এখন দেখার বিষয়, রেকর্ড আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার কতটা সফলভাবে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।