দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও কাঠামোগত পরিবর্তন এনে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ এর খসড়া সংশোধনী প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আজ ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
উক্ত খসড়া সংশোধনীর ওপর আগামী ২ (দুই) সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি আহ্বান করেছে কমিশন। খসড়া সংশোধনীতে মার্জিন ঋণের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ঝুঁকির মাত্রা হ্রাস এবং বাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় বেশ কিছু বৈপ্লবিক ও কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া সংশোধনীর প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মার্জিন ঋণের সীমা এবং নতুন অনুপাত: নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের ইকুইটি (Equity)-এর সমপরিমাণের বেশি অর্থাৎ ১:১ অনুপাতের বেশি মার্জিন ঋণ দিতে পারবে না। তবে তালিকাভুক্ত লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই অনুপাত আরও কঠোর করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই ১:০.২৫ এর বেশি হবে না।
২. মার্জিন লোন পাওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা: এখন থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে কোনো গ্রাহকের হিসাবে ন্যূনতম ৩ (তিন) লাখ টাকার নিজস্ব বিনিয়োগ না থাকলে, তিনি মার্জিন অর্থায়ন বা লোন সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
৩. মার্জিন কল ও বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি (Force Sale): সার্বক্ষণিক ‘সংরক্ষিতব্য মার্জিন’ (Maintenance Margin) হিসেবে গ্রাহকের ইকুইটি মার্জিন অর্থায়নের ন্যূনতম ৭০ শতাংশ থাকতে হবে। কোনো কারণে ইকুইটি ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন অর্থায়নকারী অবিলম্বে ই-মেইল বা নিবন্ধিত মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে ‘মার্জিন কল’ করবে। মার্জিন কলের পর ৩টি ট্রেডিং দিবসের মধ্যে গ্রাহক মার্জিন সামঞ্জস্য করতে না পারলে অর্থায়নকারী অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারবে। তবে, যদি কোনো গ্রাহকের ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ ছাড়াই মার্জিন অর্থায়নকারী গ্রাহকের হিসাব সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিক্রি (Force Sale) করতে বাধ্য থাকবে।
৪. একক সিকিউরিটিতে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা (Single Security Exposure): কোনো একটি নির্দিষ্ট শেয়ার বা সিকিউরিটিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে ‘একক সিকিউরিটি মার্জিন অর্থায়ন সীমা’ নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার মোট মার্জিন অর্থায়নের (Total Outstanding) ২০ শতাংশের বেশি কোনো একক সিকিউরিটিতে ঋণ দিতে পারবে না। একই সাথে কোনো একক গ্রাহককেও মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি কোনো একক সিকিউরিটিতে মার্জিন দেওয়া যাবে না।
৫. যেসকল শেয়ারে মার্জিন ঋণ মিলবে না: স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ ব্যতীত অন্য কোনো সিকিউরিটিতে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। তাছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জের ‘G’, ‘N’, এবং ‘Z’ ক্যাটাগরিভুক্ত সিকিউরিটিজ এবং SME, ATB ও OTC প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোনো সিকিউরিটিজের বিপরীতে কোনো মার্জিন ঋণ পাওয়া যাবে না।
৬. পি/ই রেশিও এবং পি/বি রেশিও’র নতুন শর্ত: যেসব কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত (P/E Ratio) ৩০-এর অধিক অথবা যাদের আয় ঋণাত্মক (Negative EPS), সেসব সিকিউরিটিজে কোনো মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। তবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য আর্থিক সেবা দানকারী কোম্পানির ক্ষেত্রে P/E রেশিও-র পরিবর্তে প্রাইজ টু বুক ভ্যালু (P/B Ratio) বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে P/B রেশিও ৩-এর বেশি হলে মার্জিন ঋণ পাওয়া যাবে না। আর বিমা (ইনস্যুরেন্স) কোম্পানির ক্ষেত্রে P/B রেশিও ১-এর অধিক হলে মার্জিন ঋণ সুবিধা মিলবে না।
৭. নিজস্ব মূলধনের সর্বোচ্চ ৫ গুণ পর্যন্ত মার্জিন অর্থায়ন: কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান (যেমন: স্টক-ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক) তার প্রকৃত মূলধন (Core Capital) বা নিট সম্পদ (Net Worth)-এর যেটি বেশি, তার সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) গুণের বেশি অর্থ মোট মার্জিন ঋণ হিসেবে প্রদান করতে পারবে না।
৮. পৃথক ব্যাংক হিসাব ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি: মার্জিন অর্থায়নকারীদের নিজস্ব নামে ও গ্রাহকদের মার্জিন অর্থায়নের নিমিত্তে একটি পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে, যা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী সংস্থায় ন্যূনতম ২ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করতে হবে, যারা বছরে অন্তত ৪টি সভা করবে এবং সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদে (Board Meeting) উপস্থাপন করবে। পাশাপাশি, ইসলামিক শরিয়াহ ভিত্তিক মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ডের নীতিমালার বিষয়টিও এতে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিএসইসি জানিয়েছে, এই খসড়া সংশোধনীর ওপর আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রাপ্ত মতামত ও পরামর্শ যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।