দেশের শেয়ার বাজার টানা দরপতনে বিপর্যস্ত। আজ বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর)সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস সূচকের ভয়াবহ পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এ নিয়ে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত ৫ কার্যদিবসে সূচক কমেছে ২৬৫ পয়েন্ট। অব্যাহত পতনে মূল্যসূচক গত সাড়ে চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। এছাড়া লেনদেন কমতে কমতে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমেছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র। শেয়ারবাজারের এ দুরবস্থায় দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা।
বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে। তারা বলেছেন, এই ব্যাংকগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি শেয়ার রয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, তাদের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’। এটা কীভাবে মেনে নেবেন বিনিয়োগকারীরা? ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পেছনে কি তারা দায়ী? বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়েছে এক বছরের বেশি সময় হয়েছে। কিন্তু বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ডিএসই তথ্য বলছে, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এতটাই প্রকট যে, লেনদেনে ভালো-মন্দ সব ধরনের শেয়ারেরই ঢালাও দরপতন হচ্ছে।
আজ ডিএসইতে লেনদেন শুরু হওয়ার অল্প সময় পরই একের পর এক শেয়ারদর কমতে থাকে। দিনশেষে এই বাজারে লেনদেনকৃত মোট ৩৮৪ টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ১৫ টির। আর কমেছে ৩৫২ টির। অর্থাৎ, লেনদেনকৃত প্রায় ৯১ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদরই কমেছে। আর ১৭ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। আজ বাজারে ভালো-মন্দ সব ধরনের শেয়ারেরই ঢালাও দরপতন হচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একজন পরিচালক বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ভালো সংবাদ নেই। যে কারণে বাজারে ধারাবাহিকভাবে পতন হচ্ছে। পাঁচ ব্যাংকের বিলুপ্তির ফলে শেয়ার মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণায় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকগুলোর ধসের জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, অডিটর, বানোয়াট রেটিং ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতা দায়ী। অথচ তাদের কাউকে ধরা হচ্ছে না।তিনি আরও বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে শেয়ার কিনেছেন, এটাই কি তাদের অপরাধ? তিনি বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বাজারের উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে হয়তো এসবের সুফল পাওয়া যাবে, কিন্তু স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগকারীরা কিছু পায়নি।
এছাড়াও গত ৬ নভেম্বর নতুন মার্জিন লোন রুলস পাশ হওয়াতে বিভিন্ন হাউজে ফোর্স সেলের কারণেও বাজারের অস্বাভাবিক পতন হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।
এদিকে ঢালাও দরপতনের পাশাপাশি শেয়ার বাজারে প্রতিনিয়ত লেনদেনের পরিমাণও কমছে,আজ ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে মাত্র ৩৮৩ কোটি টাকা। গত কার্যদিবসে লেনদেন হয় ২৯০ কোটি টাকা। এ হিসেবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় আজ লেনদেন বেড়েছে ৯৩ কোটি টাকা।
শেয়ার বাজার সংশ্লিষ্ট আরও একজন বিশ্লেষক বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এছাড়া, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণারও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে। তিনি বলেন, এর দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এড়াতে পারে না। কারণ, ব্যাংকগুলোর খারাপ অবস্থা তো এক দিনে হয়নি। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এছাড়া, ব্যাংকগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। তাই এক্ষেত্রে তাদেরও দায় রয়েছে। তারাও ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি এ ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদেরও সতর্ক করা হয়নি।