অর্থ লিপি

৭ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে বড় পরিবর্তন, নতুন তালিকায় নেই সালমান এফ রহমান

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

দীর্ঘদিনের পরিচালনা ও কার্যক্রমসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসির নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনে অনাপত্তি দিয়েছে।

নতুন প্রস্তাবিত পর্ষদে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নাম নেই। ফলে দীর্ঘ সময় পর গ্রুপটির তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পর্ষদে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।

৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিএসইসির কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে অনাপত্তিপত্র পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

নতুন পর্ষদে যারা

বিএসইসির অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বেক্সিমকো লিমিটেডের ৭ সদস্যের পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে থাকছেন এএসএফ রহমান। তিনি সালমান এফ রহমানের ভাই এবং বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা।

পর্ষদের অন্য সদস্যরা হলেন ও.কে. চৌধুরী, ইকবাল আহমেদ, আজমল কবির ও কামরুন নাহার আহমেদ। এদের মধ্যে চারজন স্পন্সর গ্রুপ মনোনীত পরিচালক। এছাড়া শাহ মনজুরুল হক স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে থাকছেন। কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী আরও একজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করা হবে।

শাইনপুকুর সিরামিকসের প্রস্তাবিত পর্ষদেও একই পাঁচজন স্পন্সর ও স্পন্সর গ্রুপ মনোনীত পরিচালক থাকছেন। প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী আরও দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করা হবে।

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর উদ্যোগ

বিএসইসির এ সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে দুই কোম্পানির দীর্ঘদিনের পরিচালনা ও আর্থিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত জটিলতা। ২০২৪ সালের আগস্টের পর কোম্পানি দুটির নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান দুটির পক্ষ থেকে বিএসইসিকে জানানো হয়েছে, নতুন পর্ষদ অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং বকেয়া আর্থিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য বিধিবদ্ধ কার্যক্রম সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্তত কয়েকটি প্রান্তিক ও বার্ষিক হিসাব এখনও বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একাধিক প্রান্তিকের হিসাব রয়েছে। চলতি মাসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সীমাও সামনে এসেছে।

মামলা প্রত্যাহারের শর্ত

বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো তাদের করা মামলা প্রত্যাহার করবে। মামলা প্রত্যাহারের পর কমিশনের আগের সংশ্লিষ্ট আদেশগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

এর ফলে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানিগুলোর নিয়মিত পরিচালনা, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সালমান এফ রহমানকে ঘিরে পরিবর্তন

২০২৪ সালের আগস্টের পর বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থাকে ঘিরে নানা জটিলতা তৈরি হয়। একই সময়ে সালমান এফ রহমান বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বেক্সিমকোর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন পর্ষদ অনুমোদনের ফলে বেক্সিমকো গ্রুপের কয়েকটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামোতে তার সরাসরি উপস্থিতি থাকছে না।

ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের আদালতে দাখিল করা একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ঋণ ও দায় ছিল প্রায় ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে গ্রুপটির ঋণ গ্রহণ ও অর্থ ব্যবহারে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছু অর্থ পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিতে ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

কারখানা চালু ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার চেষ্টা

বিভিন্ন জটিলতার কারণে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে বেক্সিমকো গ্রুপের বেশ কয়েকটি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কারখানাগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদেও পরিবর্তন

এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনে অনাপত্তি দেয় বিএসইসি। ওই পর্ষদেও সালমান এফ রহমানকে রাখা হয়নি।

বিএসইসির অনুমোদিত নতুন পর্ষদে বেক্সিমকো গ্রুপের তিনজন প্রতিনিধি, আইএফআইসি ব্যাংকের একজন পরিচালক এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিষয়টিও রাখা হয়েছে।

সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ

বেক্সিমকো ও শাইনপুকুর সিরামিকসের নতুন পর্ষদ গঠনের অনুমোদনকে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে নতুন পর্ষদ গঠনই শেষ কথা নয়। বকেয়া আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার, আর্থিক দায় ব্যবস্থাপনা, কর্পোরেট সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারাই হবে নতুন পর্ষদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

পুঁজিবাজারের দৃষ্টিতে এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে, নতুন পর্ষদ কত দ্রুত কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও আর্থিক তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কতটা দূর করতে পারে তার ওপর।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।