পবিত্র ঈদুল আজহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কোরবানি। এটি কেবল পশু জবাই করার নাম নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার এক অনন্য নিদর্শন। প্রতিবছর কোরবানির সময় মুসলমানদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা যায়, কোরবানির মাংস কীভাবে বণ্টন করতে হবে এবং চামড়ার সঠিক ব্যবহার কী?
ইসলামের মূল উৎস কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো।
কোরবানির উদ্দেশ্য কী?
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তাদের গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (পরহেজগারি)।”
(সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)
অর্থাৎ কোরবানির আসল বিষয় হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও আন্তরিকতা।
কোরবানির মাংস বণ্টনের বাধ্যতামূলক কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি?
সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো, কোরবানির মাংস অবশ্যই তিন ভাগ করতে হবে। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য।
তবে কোরআন ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এভাবে তিন ভাগ করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই।
মহান আল্লাহ বলেন,
“তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের খাওয়াও।”
(সূরা আল-হাজ্জ: ২৮)
আরেক আয়াতে এসেছে,
“অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত ও ভিক্ষুককে।”
(সূরা আল-হাজ্জ: ৩৬)
এ আয়াতগুলোতে কোরবানির মাংস থেকে নিজে খাওয়া এবং অন্যকে খাওয়ানোর উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো অনুপাত নির্ধারণ করা হয়নি।
হাদিসে কী বলা হয়েছে?
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমদিকে কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন,
“তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও, সদকা কর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষণ কর।”
(সহিহ বুখারি: ৫৫৬৯, সহিহ মুসলিম: ১৯৭১)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এক বছর দুর্ভিক্ষ ও অভাব-অনটনের কারণে তিনি মাংস দ্রুত বিতরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে দরিদ্র মানুষও উপকৃত হতে পারে। পরবর্তী বছর তিনি সেই সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার করে দেন।
এ থেকে বোঝা যায়, কোরবানির মাংস বিতরণ করা অত্যন্ত উত্তম ও সওয়াবের কাজ হলেও নির্দিষ্ট পরিমাণে বা নির্দিষ্ট অনুপাতে বণ্টন করা বাধ্যতামূলক নয়।
কেউ কি পুরো মাংস নিজের জন্য রাখতে পারবেন?
ইসলামি শরিয়তের আলোকে, যদি কেউ কোরবানির মাংসের সবটুকু নিজে রেখে দেয়, তাহলে তার কোরবানি শুদ্ধ হবে। আবার কেউ চাইলে অধিকাংশ বা পুরো মাংস গরিবদের মাঝেও বিতরণ করতে পারেন।
এ বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অসহায় মানুষের মাঝে মাংস বণ্টন করা উত্তম ও অধিক ফজিলতপূর্ণ কাজ।
অন্যের মাংস বণ্টন নিয়ে সমালোচনা নয়
কেউ কতটুকু মাংস রাখলেন বা কতটুকু বিতরণ করলেন, তা নিয়ে সমালোচনা করা উচিত নয়। কারণ ইসলামে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক অনুপাত নির্ধারিত হয়নি।
মুসলমানের উচিত নিজের নিয়ত শুদ্ধ রাখা এবং অন্যের আমল সম্পর্কে অযথা মন্তব্য থেকে বিরত থাকা।
কোরবানির চামড়ার বিধান কী?
কোরবানির পশুর চামড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন,
“তোমরা কোরবানির পশুর চামড়া দ্বারা উপকৃত হও; তবে তা বিক্রি করো না।”
ফকিহগণ ব্যাখ্যা করেছেন, কোরবানিদাতা নিজ স্বার্থে চামড়ার অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন না এবং চামড়া বা গোশত দিয়ে কসাইয়ের পারিশ্রমিকও পরিশোধ করতে পারবেন না।
চামড়া কি ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, কোরবানিদাতা চাইলে চামড়াটি নিজে ব্যবহার করতে পারবেন।
চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ঘরে ব্যবহার করা, সংরক্ষণ করা কিংবা কাউকে উপহার দেওয়া বৈধ। এতে কোনো সমস্যা নেই।
চামড়া বিক্রি করলে টাকার কী হবে?
যদি চামড়া বিক্রি করা হয়, তাহলে তার মূল্য গরিব, মিসকিন, এতিম, অসহায় ও জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
কোরবানিদাতা নিজে সেই অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না।
কারা চামড়ার অর্থ পাওয়ার হকদার?
যারা জাকাত ও ফিতরা গ্রহণের উপযুক্ত, তারাই মূলত কোরবানির চামড়ার অর্থ পাওয়ার অধিকারী।
বিশেষ করে:
* গরিব ও অসহায় মানুষ
* এতিম শিশু
* মিসকিন
* দরিদ্র শিক্ষার্থী
* দ্বীনি শিক্ষায় নিয়োজিত অভাবগ্রস্ত ছাত্র
এদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করা অধিক সওয়াবের কাজ।
কোরবানির মাংস তিন ভাগ করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যতামূলক বিধান কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেই। তবে নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া এবং গরিবদের মাঝে বণ্টন করা ইসলামের শিক্ষা ও উত্তম আমল।
একইভাবে কোরবানির চামড়া নিজে ব্যবহার করা বৈধ হলেও বিক্রির অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করা যাবে না; বরং তা গরিব, মিসকিন, এতিম ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেন থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং মানবিকতা ও ত্যাগের চেতনাকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের কোরবানি কবুল করুন এবং এর মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।