‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে’ অনবদ্য এই পঙক্তি বিংশ শতাব্দির অন্যতম পরাবাস্তব আর উত্তর আধুনিক ধারার বাঙ্গালি কবি জীবনানন্দ দাশের। তিনি স্কুল জীবনেই বাংলা ও ইংরেজিতে লেখালেখি শুরু করেন।
বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎদের মধ্যে জীবনানন্দ অগ্রগণ্য। তিনি প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী কবি ও লেখকের জীবন কেটেছে চরম দরিদ্রতার মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসাবে তিনি সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত। তাঁকে বাংলা ভাষার শুদ্ধতম কবি অভিধায় আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি কিংবদন্তি এই কবির জন্মদিন।
আরও পড়ুন-কাব্যগ্রন্থ ‘নরক ভূমি’ পাঠকের হাতে আসতে যাচ্ছে
দখিনের বরিশাল ছিল তৎকালীন পূর্ববাংলার একটি মহকুমা শহর। কীর্তনখোলা নদীর তীরে ছিমছাম মফস্বল শহরে বাস করতেন বরিশাল কালেক্টরেটের কর্মচারী সর্বানন্দ দাশ। পদ্মার (কীর্তিনাশা) ভাঙনে তাঁদের ভিটেমাটি বিলীন হলে মুন্সীগঞ্জের গাউপাড়া গ্রাম থেকে বরিশালে এসে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষাবিস্তার ও সামাজিক কর্মকান্ডে সর্বানন্দ এতটাই খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন যে, বরিশাল মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে তিনি খোদ অশ্বিনীকুমার দত্তকেও পরাজিত করেন। বরিশাল শহরে সর্বানন্দ ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
বরিশাল শহরের যে বাড়িতে সর্বানন্দ থাকতেন, সেটি ছিল অশ্বিনীকুমার দত্তের বাড়ির উল্টোদিকেই। এখন অশ্বিনীকুমার দত্তের বাড়িটি বরিশাল কলেজ। ১৮৯৪ সালে বিয়ে হয় সত্যানন্দ দাশও কুসুমকুমারী দাশের। বিয়ের ৫ বছর পরে ১৮৯৯ সালের এই বাড়িতেই জন্ম নেন তাঁদের প্রথম সন্তান জীবনানন্দ দাশ। সর্বানন্দ এই বাড়িতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছিলেন। তবে সর্বানন্দের পুত্ররা বাড়িটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
আরও পড়ুন – কবি টিএম মিলজার হোসেনের কবিতা ‘ভয়ঙ্কর’
তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগনা নিবাসী। তাঁর মা কবি কুসুম কুমারী দাশ ও পিতা সত্যনানন্দ দাশ। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে নিবাস স্থানান্তরিত করেন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন।
এরপর তাঁরা আলেকান্দা এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে কিছুদিন থাকেন। সর্বানন্দর বন্ধু জগচ্চন্দ্র দাশের পত্নী মুক্তকেশী গুপ্তার বসতবাড়ির একাংশে অনুমতিসূত্রে জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ দাশ, কাকা হরিচরণ দাশসহ অন্য কাকারা মিলে একটি ঘর নির্মাণ করেন। তবে মালিকানা বদল নিয়ে সে বাড়িটি নিয়েও বিপত্তি বাঁধে। ফলে সম্পূর্ণ নিজ মালিকানাধীন একটি বাড়ির জন্য হরিচরণ ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। মূলত তারই একাগ্র অন্বেষণ ও উৎসাহে অন্য ভাইদের সহায়তায় শহরের বগুড়া রোডে ১৯০৭ সালে একটি ঘর নির্মাণ করা হয় এবং তাদের পিতা সর্বানন্দের নামানুসারে বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘সর্বানন্দ ভবন’।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি (বঙ্গাব্দ ৬ ফাল্গুন ১৩০৫) শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশগুপ্ত (পরবর্তীকালে গুপ্ত উপাধি ছেড়ে শুধুই দাশ)। তারিখটি ১৭ নাকি ১৮ ফেব্রুয়ারি তা নিয়ে একসময় বিভ্রান্তি ছিল। কিন্তু সেদিন যে শুক্রবার ছিল, সে বিষয়ে কবি, তাঁর স্বজন এবং পরবর্তীকালে গবেষকরাও একমত হয়েছেন। ১৮৯৯ সালের ক্যালেন্ডারে দেখা যাচ্ছে, ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল শুক্রবার। সুতরাং জীবনানন্দের জন্ম যে ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, এ নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। জীবনানন্দের জীবনীকার প্রভাতকুমার দাসও নানাভাবে এই তারিখটির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন।
জীবনান্দ দাশ এর পড়াশোনা ম্যাট্রিক ও আই এ বরিশালে। অনার্সসহ বি এ ও এম এ কলকাতায়। ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে চাকরি জীবন শুরু। বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে শিক্ষকতা করেন। দিল্লির রামযশ কলেজেও শিক্ষকতা করেন। ১৯৩০ সালে আবার দেশে ফেরেন। ১৯৩৫ সালে বরিশালের বিএম কলেজে যোগদান করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের কিছু আগে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান।
আরও পড়ুন – বুকের মধ্যখানে বাস করে ধানসিঁড়ি ও বনলতা!
স্কুলজীবনেই কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা ও ইংরেজিতে লেখালেখি শুরু করেন। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় প্রকৃতির যে বর্ণনা করে গেছেন তা যে কারোর মনেই ভিন্ন দ্যোতনার সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনানন্দের কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আসলে চিত্রময়তায় এমন অনুভূতির প্রকাশ অন্য কারো কবিতায় চোখে পড়ে না।
১৯৫৪ সালে অকাল মৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ২১টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন যার একটিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন। ‘শ্রী কাল পুরুষ’ তাঁর ছদ্মনাম।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে- ঝরা পালক (প্রকাশের কাল ১৯২৭) ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন-(১৯৪২)। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের কবিতা সমূহ পরবর্তীতে কবিতা গ্রন্থ মহাপৃথিবী (১৯৪৪) এ প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দের জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮)। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর কিছু আগে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা।
কবির মৃত্যু পরবর্তী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো- প্রকাশিত রূপসী বাংলা (১৯৫৭) এবং ১৯৬১ তে প্রকাশিত হয় বেলা অবেল কালবেলা। তাঁর অগ্রন্থিত কবিতাবলী নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলো হলো- সুদর্শনা (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), মনোবিহঙ্গম, হে প্রেম তোমার কথা ভেবে (১৯৯৮) অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯) এবং আবছায়া (২০০৪)।
আরও পড়ুন – ‘রিচিতো ধানসিড়ি’ কবি টি এম মিলজার হোসেনের কবিতা
ইংরেজি ছাড়াও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় অজস্র গল্প ও উপন্যাস। এগুলোর প্রথম সংকলন জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২)। বেশ কিছুকাল পর প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯)। পরবর্তীকালে আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী প্রকাশ করেন ১৯৮৬ সালে। ১০১টি চিঠির সংকলন জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র প্রকাশিত হয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে।
লিখেছিলেন-
‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
জীবনানন্দ দাশ ১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে, ১৯৫২ সালে নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।