মেডিসিনে কি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয় ?
ডায়াবেটিস এর ঔষধের কাজ হচ্ছে – যে কোন উপায়ে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল কমানো। যেন, গ্লুকোজ কমালেই সমস্যা সমাধান! ডায়াবেটিস (টাইপ-২) চিকিৎসায় নিম্নোক্ত মেডিসিন ব্যবহৃত হয় :
লিভারের গ্লুকোজ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী মেডিসিন : Metformin কাজ : প্রধানত লিভারের গ্লুকোজ সরবরাহ কমিয়ে দেয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রথম ঔষধ।
ফলাফল : কোষে গ্লুকোজ সরবরাহ কমে, ফলে দেহে অধিক চর্বি জমে। ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সি দেখা দেয়। এছাড়া মাথাব্যথা, পেটব্যথা, ডাইরিয়া ইত্যাদি সাইড এফেক্ট হতে পারে।
প্যানক্রাস কর্তৃক অধিক ইনসুলিন প্রোডাকশনের মেডিসিন : Sulfonylureas, Glinides, DPP-4 inhibitoinhibitor, Meglitinides
কাজ :প্যানক্রাসকে উদ্দীপিত করে যাতে অধিক পরিমাণে ইনসুলিন সিক্রেট করে।
ফলাফল : ডায়াবেটিস (টাইপ-২) রোগীদের রক্তে ইনসুলিন এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এমতাবস্থায় প্যানক্রাস যদি আরও ইনসুলিন প্রোডাকশন করে, তবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়বে। ফলে রোগী দিনদিন শক্তিহীন হবে এবং ওজন বাড়তে থাকবে। অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। রক্তে অতিরিক্ত ইনসুলিন এর কারণে Hyperinsulinemia দেখা দেয়। মাঝে মাঝে মেডিসিনের প্রতিক্রিয়ায় গ্লুকোজ লেভেল অস্বাভাবিক কমে যাবে – যাকে বলে হাইপো (Hypoglycemia)। তখন উল্টো চিনি খেয়ে গ্লুকোজ বাড়াতে হয়। মজার ব্যাপার!!
বডি কোষের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ানো : Thiazolidinediones
কাজ : কোষের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে চেষ্টা করে।
ফলাফল : সম্ভাব্য সাইড এফেক্ট – হার্ট ফেইলর, মূত্রথলিতে ক্যান্সার, হাড়ের ফ্রেকচার, হাই কোলেস্টেরল, মেদ বৃদ্ধি ইত্যাদি।
প্রস্রাবের সাথে গ্লুকোজ বের করে দেয়ার মেডিসিন SGLT2 inhibitors
কাজ : কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সাথে রক্তের গ্লুকোজ বের করে দেয়া।
ফলাফল : ব্যবস্থাটা ভালই হতো, কিন্তু এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভয়াবহ :
হাড় ফ্রেকচার, গ্যাংরিন, প্রস্রাব ইনফেকশন, হাই কোলেস্টেরল, লো ব্লাড প্রেসার ইত্যাদি।
ডাইজেশন স্লো করার মেডিসিন : GLP-1 receptor agonists
কাজ : খাদ্য পরিপাকের স্বাভাবিক গতিকে স্লো করা, যাতে রক্তে গ্লুকোজ লেভেল কম থাকে। কী জটিল বুদ্ধিরে বাবা!
ফলাফল : প্যানক্রাসে প্রদাহ, খাদ্য পরিপাকে সমস্যা ইত্যাদি ঝুঁকি বাড়ায়।
সিনথেটিক ইনসুলিন পুশ করা : Insulin therapy
কাজ : ডায়াবেটিস এর মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন ডোজে সিনথেটিক ইনসুলিন ইনজেকশন দ্বারা রক্তে পুশ করা হয়। উদ্দেশ্য হল – কোষের ভিতর জোরপূর্বক গ্লুকোজ ঢুকাতে চেষ্টা করা।
ফলাফল : হায়রে! বেচারা রোগীর (টাইপ-২) রক্তে এমনিতেই ইনসুলিন এর মাত্রা বেশি। সেখানে আরও ইনসুলিন পুশ করে করা হয় – যাতে কোষে জোরপূর্বক গ্লুকোজ ঢুকানো যায়। এতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়বে। মাঝে মাঝে রক্তে সুগার লেভেল ব্যাপকভাবে কমে যাবে – যাকে বলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া। রক্তে কোলেস্টেরল ও টিজি অনেক বেড়ে যায়।

মেডিসিনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয় না, তবে জোরপূর্বক সাময়িকভাবে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ হয়। জোরপূর্বক গ্লুকোজ লেভেল কমাতে গিয়ে দেহের বিভিন্ন অর্গান ও সিস্টেমে খারাপ প্রভাব ফেলে। প্রচলিত চিকিৎসায় ডায়াবেটিস এর মূল কারণ (root cause) – ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কে উপেক্ষা করা হয়। ফলে ডায়াবেটিস আরোগ্য বা নিয়ন্ত্রণ না হয়ে রোগী ক্রমশ জটিলতর ধাপে পদার্পণ করতে থাকে।
সূত্র : WebMD (ঔষধের প্রকার ও সাইড এফেক্ট)।
মেডিসিন গ্লুকোজ কমায় কিন্তু ডায়াবেটিস বাড়ায় (!)
ডায়াবেটিস (টাইপ-২) এর কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। রক্তে ইনসুলিন এর মাত্রা বেশি থাকা সত্ত্বেও কোষের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত গ্লুকোজ প্রবেশ করতে পারে না। ফলে একজন ডায়াবেটিস রোগীর দেহে একইসাথে গ্লুকোজ লেভেল বেশি থাকে (যাকে বলে হাইপার গ্লাইসেমিয়া) এবং ইনসুলিন এর মাত্রাও বেশি থাকে (যাকে বলে হাইপার ইনসুলিনেমিয়া)। ইনসুলিন ইনজেকশন ও ইনসুলিন বর্ধক মেডিসিন রক্তের গ্লুকোজ কমায় কিন্তু হাইপার ইনসুলিনেমিয়া (hyperinsulinemia) বৃদ্ধি করে। অতিরিক্ত ইনসুলিন টক্সিসিটি ঘটায়। হাইপার ইনসুলিনেমিয়া এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া :
– ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়ে এবং ডায়াবেটিস
– মেদ বৃদ্ধি পায় (ওজন বাড়ে)
– মেটাবলিজম সিন্ড্রোম
– উচ্চ রক্তচাপ
– হাই কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি)
– হাই ইউরিক এসিড
– ইনফ্লেমেশন
– রক্তনালী হার্ড হয়ে যাওয়া (artherosclerosis)
– কতিপয় ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়
– Alzheimer’s disease
ডায়াবেটিসের ঔষধ খেলে মাঝেমধ্যে চিনিও খেতে হয় – ইন্টারেস্টিং!

ডায়াবেটিক কন্ডিশন অনুযায়ী ইনসুলিন ও মেডিসিনের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। আর তার সাথে সমন্বয় রেখে ডায়েট চার্ট দেয়া হয়। ঔষধের ডোজ ও খাবারের তারতম্য হলেই বিপদ হবার আশঙ্কা আছে। ঔষধের ডোজ বেশি হলে কিম্বা কোন আহার (meal) বাদ পড়লেই রক্তের গ্লুকোজ লেভেল ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে। যাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া (hypoglycemia)। উল্লেখ্য যে, ডায়াবেটিস (টাইপ-২) রোগীদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয় কেবল তখনই, যখন সে মেডিসিন নেয়। এই হাইপোগ্লাইসেমিয়া এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে : ঘাম ও শরীর কাঁপা (মাইল্ড কন্ডিশনে), অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এমনকি মৃত্যু!
এজন্য ঔষধ গ্রহণকারী রোগীকে কঠোর ডিসিপ্লিন মানতে বলা হয়। যেমন – কোন মিল বাদ দেয়া যাবে না, অল্প অল্প করে সারাদিন খান, বারবার গ্লুকোজ টেস্ট করুন, নিয়মিত ওষুধ খান, নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যান,… আর হাইপো হলে চিনির শরবত খান… VERY INTERESTING!!!
সূত্র : WebMD, The Diabetes Code
লিখেছেন
Engr. Shafiqul Islam
তাহলে ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে কি করতে হবে ? পরবর্তী পর্বে ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে সমাধান ও প্রতিকার নিয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করা হবে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।