শেয়ারবাজারে ফান্ডামেন্টাল বা মৌলভিত্তির ভালো কোম্পানি হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতি বছরই বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হারে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে । তা সত্ত্বেও এসব শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না।
বিগত কয়েকমাসে বিনিয়োগকারীদের জন্য উচ্চ লভ্যাংশ ঘোষণার পরও শেয়ারের দাম কমেছে বেশ কিছু কোম্পানির। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থার ঘাটতির পাশাপাশি স্বল্প মূলধনি ও উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারদর দ্রতবাড়ার কারণে ভালো শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাচ্ছেনা।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা এমনিতেই বেশ কম। তার ওপর বাজারের হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণে নতুন করে দেশী–বিদেশী ভালো কোম্পানিগুলোও আসছে না। ফলে এখানে বিনিয়োগযোগ্য ভালো শেয়ারের সংখ্যা কম বলে প্রায়ই অভিযোগ উঠছে। এ অবস্থায় উচ্চহারে লভ্যাংশঘোষণাকারী কোম্পানির শেয়ারদরে নিম্নমুখিতা বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি বাজার বিমুখ করে তুলবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুসারে, গত কয়েক মাসে ত্রিশের অধিক স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের জন্য ২০ শতাংশ থেকে থেকে ৪১০০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১০০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীননগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশ। উচ্চহারে লভ্যাংশ ঘোষণার পরও কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় লিন্ডে বাংলাদেশের পর্ষদ আরো ৪০০ শতাংশ চূড়ান্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত মোট নগদ লভ্যাংশের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫০০শতাংশে। সর্বশেষ ৪০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণায় আজ ৮ শতাংশ দাম কমেছে।
ভালো লভ্যাংশ ঘোষণাকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ ২০২৪ হিসাব বছরে ৫০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৫.২২ শতাংশ। ওয়ালটন হাই–টেক ইন্ডাস্ট্রিজ সর্বশেষসমাপ্ত হিসাব বছরে ৩৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে এবং এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ৩৪.৩০ শতাংশ। বহুজাতিক কোম্পানি বাটা সু ২০২৪ হিসাব বছরে ৩৪০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ১০.৯৭ শতাংশ। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে ৩০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবংএ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ৫.১৯ শতাংশ। মেঘনা পেট্রোলিয়াম সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৭০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবং এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ৫.৪২ শতাংশ।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এ প্রত্যাশার কারণে বর্তমান সরকারের শুরুর কয়েক দিন পুঁজিবাজারে বেশ গতি ফিরে এসেছিল। যদিওবাজারের এ গতি ফিকে হয়ে যেতে বেশি দিন লাগেনি। কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন নাহওয়ার কারণে অংশীজনদের মধ্যেও হতাশা কাজ করছে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারের সূচক ওলেনদেনে গতি ফিরে আসেনি। বরং পুঁজিবাজারে এক প্রকার স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে।
সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে যমুনা অয়েল ১৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবংএ সময়ে এর শেয়ারদর কমেছে ৮.৫১ শতাংশ। ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১১০ শতাংশ নগদল ভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবং এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ২ শতাংশ।
ওষুধ খাতের আরেক কোম্পানি রেনাটা সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৯২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ৩১.৮২ শতাংশ।
ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ২০২৪ হিসাব বছরেবিনিয়োগকারীদের জন্য ৬৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর পর থেকে শেয়ারটির দর কমেছে ১৬ শতাংশ। উচ্চহারে লভ্যাংশ ঘোষণার পরও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এসব শেয়ারের দর ছিল নিম্নমুখী। আগের বছরের তুলনায় বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলেও এর কোনো প্রভাব এসব কোম্পানির শেয়ারদরে প্রতিফলিত হয়নি।
একজন বাজার বিশ্লেষক জানান,সার্বিকভাবে বাজারের প্রতি আস্থার ঘাটতির একটি বিষয়ছিল। তাছাড়া সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরের তুলনায় আগের হিসাব বছরে ট্রেজারি বিলবন্ডের সুদহার কম ছিল। ফলে এবার বেশি লভ্যাংশ দিলেও সেটি বিনিয়োগকারীদের সেভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তবে যেসব কোম্পানি উচ্চহারে লভ্যাংশ দিয়েছে, সামনে তাদেরশেয়ারে ইতিবাচক রিটার্ন আসবে বলে আশা করছি।
সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ইউনাইটেড জেনারেশন অ্যান্ডডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমস ৬০ শতাংশ, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ ৩৮, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স২৫, বিএসআরএম লিমিটেড ৩৫, বিএসআরএম স্টিলস ৩২, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস ৪০ ও এপেক্স ফুটওয়্যার ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণা সত্ত্বেও গত কয়েক মাসে এসব শেয়ারের দর ছিল নিম্নমুখী।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সবাই শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা করেছিলেন। বিশেষ করে শেয়ারবাজারের ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি ও শেয়ার দর কারসাজি প্রতিরোধে কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল সবার। যদিও এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ অবস্থায়বাজার পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা কাজ করছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
দেশের শেয়ারবাজারেবিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানির শেয়ারের বেশ ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারের উন্নয়নে সব সময়ই ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে থাকে।
গত ১৬ বছরে দেশের শেয়ারবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির নামে অসংখ্য অনিয়ম হয়েছে। এ সময়ে যেসব কোম্পানি শেয়ারবাজারে এসেছে তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এরই মধ্যে দুর্বল কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ছয় মাসে ভালো ও বড় কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বরং এ সময়ে আগের মতোই দুর্বল ও উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারদর কোনো কারণ ছাড়াই বাড়তে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে বাজার কারসাজি প্রতিরোধে কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট দুর্বল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সব মিলিয়ে শেয়াবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার ঘাটতি কাজ করেছে। যার ফলে ভালো কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী দেখা যায়নি।
শেয়ার বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একজন অভিজ্ঞ বাজার বিশ্লেষক বলেন, শেয়ারবাজারের মূল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের মিউচুয়াল ফান্ডের অবস্থা এত দুর্বল যে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভিত তৈরি করতে পারিনি। এর ফলে ভালো শেয়ারের ক্ষেত্রে যেপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অবস্থান নেবেন সেটি হচ্ছে না। এর বিপরীত চিত্র হচ্ছে স্বল্পমূলধনি ও উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারের দর দ্বিগুণ, তিন গুণ হয়ে যাচ্ছে। গতছয় মাসেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা গুজবের ভিত্তিতে এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করছে।
দেশের শেয়ারবাজার অনেকটাই ক্যাসিনোর মতো হয়ে গেছে বলা যায়। এসব সমস্যার কারণে আমাদের শেয়ারবাজার এগোতে পারছে না। আমাদের শেয়ারবাজার অত্যন্ত অপরিণত একটি বাজার। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির মৌলভিত্তিসহ বিভিন্ন আর্থিক বিশ্লেষণ পৌঁছে দেবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। যতদিন এখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী না আসবে, ততদিন পর্যন্ত রিসার্চ ভিত্তিক বিনিয়োগ হবে না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বর্তমানে যেসব সংস্কার করছে, সেগুলো প্রকৃত অর্থে কোনো সংস্কার নয়। শেয়ারবাজার কেন পরিণত আচরণ করছে না, কেন উন্নত হচ্ছে না, এখানে কেন বিনিয়োগকারী কমে যাচ্ছে, কেন এখানে ভালো ব্রান্ড কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য এগিয়ে আসছে না, সেগুলোর কারণ খুঁজে বের করে যদি সংস্কার করা না হয় তাহলে এ সংস্কারের কোনো মানে হয় না।’