দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে আবারও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সূচকের ঊর্ধ্বমুখী গতি, বাড়তি লেনদেন এবং অধিক সংখ্যক শেয়ারের দর বৃদ্ধিতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার চিত্র কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৮ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ০০ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৯০৩ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সূচক ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করেছে। এখন বাজারের পরবর্তী বড় লক্ষ্য ৬ হাজার পয়েন্ট। লেনদেন ছাড়িয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
আজকের বাজারে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। দিন শেষে ডিএসইতে মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ২৮৮টি লেনদেন হয়েছে।
লেনদেন হওয়া শেয়ার ও ইউনিটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ কোটি ১৪ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬০টি। আর মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সূচকের উত্থানের সঙ্গে লেনদেনও যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অধিকাংশ শেয়ারে ছিল ক্রেতাদের দাপট
আজকের বাজারের অন্যতম ইতিবাচক দিক ছিল বাজারের বিস্তৃত অংশগ্রহণ। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৪২টির শেয়ার দর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১০১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫০টি কোম্পানির শেয়ার।
অর্থাৎ দর হারানো শেয়ারের তুলনায় দর বাড়ানো শেয়ারের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।
এ ধরনের বাজারচিত্রকে সাধারণত ইতিবাচক breadth হিসেবে দেখা হয়। কারণ শুধু কয়েকটি বড় মূলধনী শেয়ারের ওপর নির্ভর করে সূচক বাড়ার পরিবর্তে বিভিন্ন শ্রেণির শেয়ারে ক্রয়চাপ তৈরি হলে বাজারের ভিত তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়।
৬ হাজার এখন বিনিয়োগকারীদের নজরে
৫ হাজার ৯০০ পয়েন্ট অতিক্রম করার পর এখন বিনিয়োগকারীদের প্রধান নজর ৬ হাজার পয়েন্টের দিকে।
বর্তমান অবস্থান থেকে ৬ হাজারে যেতে ডিএসইএক্সকে আরও প্রায় ৯৬ পয়েন্ট অতিক্রম করতে হবে।
তবে ৬ হাজারে পৌঁছানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে ওই স্তরের ওপরে বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকতে পারে।
শক্তিশালী লেনদেন ও বিস্তৃত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সূচক ৬ হাজার অতিক্রম করে কয়েকটি সেশন ওই স্তরের ওপরে অবস্থান করতে পারলে সেটি বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংকেত হতে পারে।
কোন ধরনের শেয়ারে আসতে পারে গতি?
বাজারের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রথম সারির বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানিগুলোতে ক্রয় আগ্রহ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল, প্রকৌশল ও অন্যান্য শিল্প খাতের নির্বাচিত শেয়ারে মুভমেন্ট দেখা যেতে পারে।
তবে সূচক বাড়ছে বলেই সব শেয়ারের দাম বাড়বে, এমনটা নয়। বরং কোম্পানির মৌলভিত্তি, আয়, EPS, NAV, ঋণের পরিমাণ, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও বর্তমান মূল্যায়ন বিবেচনায় নিয়ে শেয়ার নির্বাচন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
৬ হাজার ভাঙলে নতুন গতি পেতে পারে বাজার
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে ৬ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করা গেলে বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক অপেক্ষমাণ বিনিয়োগকারী নতুন করে বাজারে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তবে একদিনের জন্য ৬ হাজার অতিক্রম করার চেয়ে ৬ হাজারকে নতুন সাপোর্টে পরিণত করাই হবে বাজারের জন্য বড় সাফল্য।
যদি শক্তিশালী লেনদেনের মাধ্যমে ৬ হাজার অতিক্রম করে বাজার সেখানে স্থিতিশীল হতে পারে, তাহলে পরবর্তী সময়ে ৬ হাজার ১০০ থেকে ৬ হাজার ২০০ পয়েন্ট অঞ্চল নতুন পরীক্ষার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
সূচকের পাশাপাশি নজর দিতে হবে লেনদেন ও বিস্তৃতিতে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু ডিএসই এক্সের অবস্থান দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বরং তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে:
সূচক – লেনদেন এবং বাজারের অংশগ্রহণ
আজ তিনটি সূচকেই ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ডিএসইএক্স বেড়েছে ১ শতাংশ, ডিএস৩০ বেড়েছে ০ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ডিএসইএস বেড়েছে ০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একই সঙ্গে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১১৫ কোটি টাকার বেশি এবং ২৪২টি শেয়ারের দর বেড়েছে।
এগুলো বাজারে ক্রয় আগ্রহ বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে।
তবে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ
সূচক ৬ হাজারের কাছাকাছি চলে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে শেয়ার কেনার আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই পর্যায়ে গুজব, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও কোম্পানি নির্বাচনই হবে সফল বিনিয়োগের মূল চাবিকাঠি।
অর্থলিপির বিশ্লেষণ
১১ আগস্টের বাজারচিত্র বোঝাচ্ছে ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের বাধা আপাতত অতিক্রম করেছে ডিএসইএক্স। সূচকের সঙ্গে লেনদেন এবং বাজারের বিস্তৃত অংশগ্রহণও ইতিবাচক হওয়ায় বাজারে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
এখন সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ৬ হাজার পয়েন্ট।
৬ হাজার ভাঙবে কি না, সেটি সময়ই বলবে। তবে আজকের বাজারের গতি বলছে, ৬ হাজারের লড়াই এখন আর দূরের বিষয় নয়।
আর যদি শক্তিশালী লেনদেন ও ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ৬ হাজার অতিক্রম করে সেটিকে সাপোর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য শুধু একটি সূচকীয় মাইলফলক নয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।