দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) লেনদেন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এর ফলে বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিক দরপতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে পুঁজি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কমাতে সরকারের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে বাজারে কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখার পরিবর্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আজকের বাজার পরিস্থিতি
রোববার ডিএসইএক্স ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
একই সময়ে ডিএসই শরিয়াহ সূচক (ডিএসইএস) ১৯ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৫ দশমিক ৪০ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ২৩ দশমিক ৩০ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ২ হাজার ৭২ দশমিক ১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
দিনটিতে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ২৭টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ৩৩৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির।
দিন শেষে ১ লাখ ৮২ হাজার ১৮৬টি চুক্তির মাধ্যমে ২৩ কোটি ৬৪ লাখের বেশি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
আগের কার্যদিবসের তুলনায় বড় পতন
গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ডিএসইএক্স ২২ দশমিক ৭১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৭ পয়েন্টে অবস্থান করেছিল। মাত্র এক কার্যদিবসের ব্যবধানে আজ সূচক কমেছে আরও ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট।
অন্যদিকে, ১০ সেপ্টেম্বরের তুলনায় আজ মোট লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ৫৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা লেনদেন হলেও রোববার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
শেয়ার হাতবদলের পরিমাণও ২১ কোটি ৭৬ লাখ থেকে বেড়ে ২৩ কোটি ৬৪ লাখে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাপক দরপতনে বাড়ছে উদ্বেগ
আজকের বাজারে প্রায় ৮৭ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে। ফলে সূচকের পাশাপাশি অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করছে। অনেকে লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কায় শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়লেও বিনিয়োগের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকছে।
তবে শুধু সূচকের পতন ঠেকানোই বাজারের সমস্যার সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গাটি শক্তিশালী করা, ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা এবং বাজারে অনিয়ম ও কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আস্থা ফেরাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাজারে কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর পরিবর্তে মৌলভিত্তিক ও স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, বাজার কারসাজি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আতঙ্ক বা অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরির প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও ব্যবস্থা জরুরি।
বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে শেয়ারদর নির্ধারিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে বাজারে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম, কারসাজি বা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সূচকের ওঠানামা হিসেবে না দেখে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।