দেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে শঙ্কা তৈরি হলেও, বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা ও কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনায় নিয়ে কিছু অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী বর্তমান দরপতনকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য তা আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাজারের কোনো পরিস্থিতিকেই নিশ্চিত লাভের সুযোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, মূল্যায়ন, লভ্যাংশের ইতিহাস এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
স্বল্পমূল্যে ভালো শেয়ার কেনার সুযোগ
বাজারে বড় ধরনের দরপতনের সময় অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে যায়। এর মধ্যে মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও ব্যবসায়িকভাবে সম্ভাবনাময় কিছু কোম্পানির শেয়ারও বাজারের সামগ্রিক চাপের কারণে তুলনামূলক কম দামে লেনদেন হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত মূল্য ও বর্তমান বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে পারেন। তবে শুধু শেয়ারের দাম কমেছে বলেই সেটিকে সস্তা বা আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
লভ্যাংশভিত্তিক বিনিয়োগে গুরুত্ব
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করে মুনাফা অর্জন এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা থাকা কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে অতীতের লভ্যাংশ ভবিষ্যতে একই হারে পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই লভ্যাংশের পাশাপাশি কোম্পানির আয়, নগদ প্রবাহ, ঋণের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাজার পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকলেও সময় অনিশ্চিত
পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক। অতীতে বিভিন্ন সময় বড় ধরনের সংশোধন বা সংকটের পর বাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনাও দেখা গেছে। তবে বাজার কখন এবং কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধৈর্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ।
গড় ক্রয়মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা
বর্তমান বাজারদর আগের ক্রয়মূল্যের তুলনায় কম হলে অনেক বিনিয়োগকারী একই শেয়ার আরও কিনে গড় ক্রয়মূল্য কমানোর কথা বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু শুধু গড় ক্রয়মূল্য কমানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কোম্পানির মৌলভিত্তিতে কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে কি না, ভবিষ্যৎ আয় ও ব্যবসার সম্ভাবনা কেমন এবং বর্তমান মূল্যায়ন যৌক্তিক কি না, তা যাচাই করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহায়ক
একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি বা খাতে সম্পূর্ণ বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত না করে বিভিন্ন খাত ও সম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য করা যেতে পারে। এতে কোনো একটি কোম্পানি বা খাতের নেতিবাচক পারফরম্যান্সের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে বৈচিত্র্য থাকলেও বাজারঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা ও বিনিয়োগের সময়সীমার সঙ্গে পোর্টফোলিওর কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
‘সবাই বিক্রি করলে কিনতে হবে’ ধারণার ক্ষেত্রেও সতর্কতা
পুঁজিবাজারে প্রচলিত একটি ধারণা হলো, বাজারে যখন ব্যাপক বিক্রির চাপ থাকে তখন ভালো শেয়ার তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু শুধু অন্যরা বিক্রি করছে বলেই শেয়ার কেনা উচিত, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।
কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল হলে কম দাম আরও কমতে পারে। তাই বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রতিটি কোম্পানিকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
আবেগ ও গুজব নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত
বাজারের অস্থির সময়ে গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা অস্বাভাবিক মুনাফার আশ্বাসের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে নিবন্ধিত ব্রোকারেজ হাউস, পেশাদার বিনিয়োগ পরামর্শক বা যোগ্য আর্থিক বিশ্লেষকের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
সামর্থ্যের মধ্যে বিনিয়োগই গুরুত্বপূর্ণ
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন অর্থ ব্যবহার করা উচিত নয়, যা স্বল্পমেয়াদে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে প্রয়োজন হতে পারে। বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং সম্ভাব্য ক্ষতি বহনের ক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে শুধু আতঙ্কের দৃষ্টিতে না দেখে তথ্য, মৌলভিত্তি, মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তবে কম দাম মানেই ভালো বিনিয়োগ নয় এবং বাজার পুনরুদ্ধারও নিশ্চিত নয়। তাই আবেগ বা গুজবের পরিবর্তে যাচাই করা তথ্য ও নিজস্ব ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
Author
-
মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।
View all posts