বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমি, ফ্ল্যাট ও স্বর্ণকে বেশি গুরুত্ব দেন। অনেকের কাছে জমি কেনা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ে তোলার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। ফ্ল্যাট থেকেও ভাড়া আয় ও সম্পদের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে, স্বর্ণের অন্যতম সুবিধা হলো প্রয়োজনে তুলনামূলক সহজে বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা যায়।
তবে জমি বা ফ্ল্যাটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের মূলধন প্রয়োজন হয়। লাভের সম্ভাবনা থাকলেও জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দামে অর্থ ফেরত পাওয়া সব সময় সহজ নয়। স্বর্ণের ক্ষেত্রেও ক্রয়-বিক্রয়ের দামের পার্থক্য ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় রাখতে হয়।
শেয়ারবাজারেও রয়েছে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা
বিশ্বের অনেক সম্পদশালী মানুষের সম্পদ গড়ে ওঠার পেছনে শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, উপযুক্ত শেয়ার তুলনামূলক দ্রুত বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তর করা যায়। তবে এই সুবিধা নির্ভর করে শেয়ারের চাহিদা, লেনদেনের পরিমাণ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো একধরনের ভীতি ও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে অতীতের বড় ধস, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি এবং নানা অনিয়মের অভিজ্ঞতা অনেকের মনে শেয়ারবাজারকে জুয়াসদৃশ একটি ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিন্তু শেয়ারবাজারের প্রকৃত উদ্দেশ্য জুয়া নয়। এটি একটি দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আমাদের বাজারেও এমন কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করে, মুনাফা অর্জন করে এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়। এসব কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ, ব্যবস্থাপনার মান, মূল্যায়ন ও লভ্যাংশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত দামে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভালো রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে কোনো বিনিয়োগেই নিশ্চিত মুনাফার নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক শেয়ার নির্বাচন ও নির্ভরযোগ্য পরামর্শের অভাব
কোন কোম্পানির শেয়ার কেনা উচিত, কোন দামে কেনা যুক্তিসংগত, কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কেমন এবং দীর্ঘমেয়াদে তার সম্ভাবনা কতটুকু, এসব বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ পরামর্শ পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা সাময়িক দরবৃদ্ধি দেখে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি বাড়ে।
এখানে দায়িত্ব রয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউস, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পেশাদার বিনিয়োগ পরামর্শদাতাদের।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বিনিয়োগবান্ধব বাজার, যেখানে তথ্যের স্বচ্ছতা থাকবে, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন হবে নির্ভরযোগ্য এবং বিনিয়োগকারীরা পাবেন দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক পরামর্শ।
মনে রাখতে হবে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ মানেই প্রতিদিন শেয়ার কেনাবেচা করে মুনাফা অর্জন নয়। বরং সঠিক কোম্পানি নির্বাচন, যুক্তিসংগত মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগও এখানে রয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে শেয়ারবাজারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু সূচক বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বাড়াতে হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
আস্থা ফিরলে, সঠিক তথ্য ও পরামর্শ নিশ্চিত হলে এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা গেলে শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। এতে বিনিয়োগকারীরা যেমন নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন, তেমনি দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পুঁজিবাজার গড়ে তোলা, যেখানে বিনিয়োগ হবে জ্ঞানভিত্তিক, সিদ্ধান্ত হবে তথ্যনির্ভর এবং আস্থা হবে বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
Author
-
মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।
View all posts