“আমাদের… অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুষখোরি, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।”
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ-এর এমন বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ ও বক্তব্য নয়, বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কবে?
দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের আস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু বক্তৃতা, তদন্ত কমিটি কিংবা প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা কী বলে?
১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে সিঙ্গাপুর। তখন দেশটির সামনে ছিল সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, পানি ও আবাসন সংকট, বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা।
সেই কঠিন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে সিঙ্গাপুর রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা, দক্ষ প্রশাসন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়।
দুর্নীতি দমনে Corrupt Practices Investigation Bureau (CPIB)-এর কার্যক্রম শক্তিশালী করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পদ, পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব যেন আইনের প্রয়োগের পথে বাধা না হয়।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান শুধু কাগজে থাকলে হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগও দৃশ্যমান হতে হবে।
ঘনিষ্ঠজন হলেও ছাড় নয়
লি কুয়ান ইউয়ের শাসনামলে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো সংঘাত হলে আইনই চূড়ান্ত।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
কোনো কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় অর্থ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণই হবে বিচারের ভিত্তি।
শুধু কম বেতন নয়, জবাবদিহিতাও জরুরি
দুর্নীতি দমনে শুধু শাস্তিই যথেষ্ট নয়। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের জন্য সম্মানজনক বেতন, পেশাগত নিরাপত্তা, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং একই সঙ্গে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অর্থাৎ রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে।
সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে সম্মান দিতে হবে, আর দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের জন্য এখন কী প্রয়োজন?
বাংলাদেশে দুর্নীতি কমাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে একটি স্পষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য নীতি।
শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের ‘চোর’ বলে সমালোচনা করলে সমস্যার সমাধান হবে না।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত
অবৈধ সম্পদ কোথা থেকে এলো?
অভিযোগের তদন্ত কত দিনে শেষ হবে?
অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি কত দ্রুত হবে?
এবং আইন কি সবার জন্য সমান ভাবে প্রয়োগ হবে?
কোনো সরকারি কর্মকর্তা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের মালিক হলে যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।
কথার চেয়ে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান একশন
সিঙ্গাপুরকে বাংলাদেশের সঙ্গে হুবহু তুলনা করা যাবে না। দুই দেশের ইতিহাস, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভিন্ন। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা যে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা তার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।
বাংলাদেশও চাইলে নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু বক্তব্য দেওয়া হবে। আমরা চাই, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে শাস্তি হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের পথ বন্ধ হবে।
কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য কোনো বক্তৃতা নয়, বরং আইনের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান প্রয়োগ। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, কঠোর জবাবদিহিতা এবং বাস্তব একশন।
Author
-
মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।
View all posts