দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে সূচকের সামান্য পতন ও লেনদেন কমার মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে বাজারের সামগ্রিক চিত্রে কিছুটা মন্দাভাব থাকলেও আজকের লেনদেনে বস্ত্র (টেক্সটাইল) খাতের শেয়ারগুলো ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। দর বৃদ্ধির পাশাপাশি লেনদেনের শীর্ষ তালিকাতেও এ খাতের একাধিক কোম্পানির উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
এদিকে, টেক্সটাইল খাতে লেনদেনের সক্রিয়তার পর আগামী কার্যদিবসে কোন খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে, সেদিকে নজর থাকবে বাজারসংশ্লিষ্টদের। তবে এক দিনের লেনদেন বা ব্লক মার্কেটের বড় অঙ্কের শেয়ার লেনদেনের ভিত্তিতে পরবর্তী দিনের বাজারের গতিপ্রকৃতি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
সূচক ও লেনদেনের চিত্র
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) ১.৪৯ পয়েন্ট বা ০.০২৭ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫২৪.৩৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একই দিনে শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস (DSES) ২.১৪ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৮.০৪ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ সূচক ডিএস-৩০ (DS30) ৩.২৬ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯৪.৬৭ পয়েন্টে লেনদেন শেষ করেছে।
দিনটিতে ডিএসইতে মোট ৬৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের দিনের তুলনায় লেনদেন কমেছে প্রায় ১১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
দিনজুড়ে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১৫টি ট্রেডে ২০ কোটি ৮৩ লাখের বেশি শেয়ার হাতবদল হয়েছে। লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৪২টির দর বেড়েছে, ১৭৮টির দর কমেছে এবং ৭৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
টেক্সটাইল খাতে দর ও লেনদেনের সক্রিয়তা
দিনের লেনদেনে বস্ত্র খাতের একাধিক কোম্পানির শেয়ারে উল্লেখযোগ্য দর বৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে এ খাতের কয়েকটি কোম্পানি লেনদেনের মূল্যমানের দিক থেকেও শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
দর বৃদ্ধির তালিকায় সাইহাম কটন (SAIHAMCOT) ৭.৬২ শতাংশ বেড়ে ২৪ টাকায় এবং সাইহাম টেক্সটাইল (SAIHAMTEX) ৫.৭৪ শতাংশ বেড়ে ৪০ টাকা ৫০ পয়সায় লেনদেন শেষ করেছে। এছাড়া দুলামিয়া কটন (DULAMIACOT) ৫.৮৮ শতাংশ এবং মতিন স্পিনিং (MATINSPINN) ৪.৬০ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়েছে।
লেনদেনের মূল্যমানের দিক থেকেও এগিয়ে ছিল সাইহাম টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ৩৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। সাইহাম কটনের লেনদেন হয়েছে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের (PTL) লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
তবে কোনো খাতে দর ও লেনদেন বৃদ্ধি পেলেই সেখানে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, মূল্যায়ন এবং পরবর্তী দিনের লেনদেনের ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে মিডাস ফাইন্যান্স, পতনে এইচএফএল
দিনের দর বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল মিডাস ফাইন্যান্স (MIDASFIN)। কোম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়েছে ৮.৭০ শতাংশ। এরপর সাইহাম কটন ৭.৬২ শতাংশ, প্রিমিয়ার সিমেন্ট ৬.১৭ শতাংশ এবং এসআইপিএলসি ৬.০৯ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, দর পতনের তালিকায় ছিল এইচএফএল (HFL)। কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে ৬.৭২ শতাংশ। এছাড়া পিপলস লিজিং (PLFSL) ৫.৮৮ শতাংশ এবং প্রিমিয়ার লিজিং (PREMIERLEA) ৫ শতাংশ দর হারিয়েছে।
লেনদেনের মূল্যমানের দিক থেকে সাইহাম টেক্সটাইলের পর আইপিডিসি ফাইন্যান্সের (IPDC) ২১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং সাইহাম কটনের ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
ব্লক মার্কেটে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সক্রিয়তা
ডিএসইর ব্লক মার্কেটে মঙ্গলবার ৩৮টি কোম্পানির মোট ৫৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। উল্লেখযোগ্য লেনদেনের তালিকায় ছিল ব্যাংক খাতের কয়েকটি কোম্পানি।
এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং যমুনা ব্যাংকের ৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
ব্লক মার্কেটে বড় অঙ্কের লেনদেন কোনো কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বা বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব লেনদেনের পেছনের উদ্দেশ্য, ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় এবং লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া এটিকে ভবিষ্যৎ দরবৃদ্ধির নিশ্চিত সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
আগামী কার্যদিবসে নজর কোন খাতে?
আজকের লেনদেনে টেক্সটাইল খাতের সক্রিয়তা স্পষ্ট হলেও আগামী কার্যদিবসে কোন খাতে নতুন করে লেনদেন বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বীমা, ওষুধ ও রসায়ন এবং ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংক খাতের কয়েকটি কোম্পানির ব্লক মার্কেটে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। তবে ব্লক মার্কেটের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক বা বীমা খাতে পরবর্তী দিনের মুভমেন্ট সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ারের দর, লেনদেনের পরিমাণ, কোম্পানিভিত্তিক সংবাদ এবং সামগ্রিক বাজারের গতিপ্রকৃতি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যবেক্ষণ
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু কোনো খাতের এক দিনের দরবৃদ্ধি বা লেনদেনের আধিক্য দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে কোম্পানির মৌলভিত্তি, আয়, লভ্যাংশ, মূল্য-আয় অনুপাত (P/E), নগদ প্রবাহ এবং শেয়ারের মূল্যায়ন বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে দরবৃদ্ধির পেছনে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য বা মূল্যসংবেদনশীল সংবাদ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। গুজব বা অনুমাননির্ভর প্রত্যাশার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণই বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।
অর্থলিপির পর্যবেক্ষণ: মঙ্গলবারের বাজারে সূচক ও লেনদেন কমলেও টেক্সটাইল খাতের কয়েকটি শেয়ারে উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা দেখা গেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কার্যদিবসে এ খাতের লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, নাকি অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। এর উত্তর মিলবে পরবর্তী দিনের প্রকৃত লেনদেন ও বাজারের তথ্যেই।
অর্থলিপি | গুজব নয়, তথ্যেই আমাদের শক্তি।