দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিন শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্সসহ সবকটি সূচক কমেছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে এবং লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে ৩১৭ কোটি টাকার ঘরে। বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছে লেনদেনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করলে লেনদেন কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সামনে আসে। এর মধ্যে রয়েছে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা, বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা করার মনোভাব, আসন্ন লভ্যাংশ ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের মৌসুম, নতুন ট্রেডিং আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহারে কিছু ব্রোকারেজ হাউজের সমস্যার অভিযোগ এবং শনিবারের বিশেষ কর্মদিবস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানা।
কমেছে সবকটি সূচক
দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ১৮.৮৭ পয়েন্ট বা ০.৩৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৩৩.১৮ পয়েন্টে। শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৫.৫৮ পয়েন্ট বা ০.৫২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭২.৩৮ পয়েন্টে। অন্যদিকে, বাছাই করা ৩০টি বড় মূলধনি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট বা ০.২৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০.৫১ পয়েন্টে।
এদিন ডিএসইতে মোট ৩১৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৪টি লেনদেনের মাধ্যমে ১১ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮১৮টি শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে।
বাজারে মোট ৩৮৬টি কোম্পানির মধ্যে ২২৯টির দর কমেছে, ৯৬টির বেড়েছে এবং ৬১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ, দরবৃদ্ধির তুলনায় দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
লভ্যাংশ ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন ঘিরে অপেক্ষায় বিনিয়োগকারীরা
চলতি অক্টোবর মাস পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এ সময়ে জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলো ২০২৬ সালের সমাপ্ত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। পাশাপাশি ডিসেম্বর ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ করে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস প্রকাশের সময় চলছে।
অক্টোবরের বাকি দিনগুলোতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জুন ক্লোজিং কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা এবং ডিসেম্বর ক্লোজিং কোম্পানির তৃতীয় প্রান্তিকের ইপিএস প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী কোম্পানির আর্থিক ফলাফল ও লভ্যাংশের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারেন।
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কোম্পানির আয়, মুনাফা, লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক অবস্থান পর্যালোচনা করছেন অনেকে। এতে সাময়িকভাবে বাজারে ক্রয়চাপ ও লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সূচকের পতন ও সাপোর্ট নিয়ে সতর্ক বিনিয়োগকারীরা
দীর্ঘ সময় ধরে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়তে পারে। বর্তমান সূচক থেকে সম্ভাব্য সাপোর্ট আরও নিচে হতে পারে, এমন ধারণা থেকেও অনেকে নতুন বিনিয়োগের আগে বাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
বিশেষ করে বাজারে দরপতনের চাপ বাড়লে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নতুন করে শেয়ার কেনার পরিবর্তে নগদ অর্থ হাতে রাখাকে প্রাধান্য দেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখা, আংশিক মুনাফা তুলে নেওয়া কিংবা ঝুঁকি কমানোর কৌশল অনুসরণ করেন।
তবে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে চিহ্নিত সাপোর্ট সম্ভাব্য একটি স্তর মাত্র, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। সূচক কতটা নিচে নামতে পারে বা কখন ঘুরে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করে বাজারের চাহিদা-সরবরাহ, কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক ফলাফল এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
নতুন ট্রেডিং আইপি অ্যাড্রেসে কিছু হাউজের সমস্যার অভিযোগ
শনিবারের লেনদেন কম হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নতুন অতিরিক্ত ট্রেডিং আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে লেনদেন পরিচালনা করতে কিছু ব্রোকারেজ হাউজ সমস্যায় পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব হাউজের মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক পরিচালিত ব্রোকারেজ হাউজও ছিল বলে জানা গেছে।
যদি কোনো ব্রোকারেজ হাউজের ট্রেডিং সিস্টেমে সংযোগজনিত সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে ওই হাউজের গ্রাহকদের লেনদেন ব্যাহত হতে পারে। একাধিক হাউজে একই ধরনের সমস্যা হলে সামগ্রিক লেনদেনেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নতুন আইপি অ্যাড্রেসসংক্রান্ত সমস্যার কারণে মোট লেনদেন কতটা কমেছে, তা নির্ধারণের জন্য ডিএসইর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট হাউজগুলোর তথ্য প্রয়োজন। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে লেনদেন কমার একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বিশেষ কর্মদিবস সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলেন অনেকে
শনিবার সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এদিন ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা থাকার বিষয়টি অনেক বিনিয়োগকারী, ট্রেডার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে যথাসময়ে পৌঁছায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্গাপূজার ছুটির সমন্বয়ে শনিবার ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বিশেষ কর্মদিবসের বিষয়টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচার না থাকলে কিছু বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বাভাবিক দিনের মতো সক্রিয় নাও থাকতে পারেন।
এ কারণে এদিন বাজারে অংশগ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়টির প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণের জন্য বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি, ব্রোকারেজ হাউজের কার্যক্রম এবং লেনদেনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
লেনদেন কমা কি বাজারের দুর্বলতার ইঙ্গিত?
পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে যাওয়াকে এককভাবে বাজারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। কখনো দরপতনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ ও সতর্কতার কারণে লেনদেন কমে যায়। আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট ঘোষণা সামনে থাকায় বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করার কৌশল গ্রহণ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা, লভ্যাংশ ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষা এবং ট্রেডিং ব্যবস্থায় সমস্যার অভিযোগ, সবকটি বিষয়ই লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রতিটি কারণের প্রকৃত অবদান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কোম্পানিগুলোর সময়মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর নির্বিঘ্ন ট্রেডিং ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির মৌলভিত্তি, আর্থিক প্রতিবেদন ও ঘোষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, ডিএসইতে লেনদেন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। আগামী দিনগুলোতে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা, তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল, সূচকের গতিপ্রকৃতি এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।