ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মাসের ২য় কার্যদিবসে আবারও ১,২০০ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। তবে উচ্চ লেনদেনের এই ইতিবাচক পরিসংখ্যানও বাজারে প্রত্যাশিত প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বরং দিনের শেষভাগে বিক্রির চাপ বাড়ায় প্রধান তিনটি সূচকই নিম্নমুখী অবস্থায় লেনদেন শেষ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, লেনদেন বাড়লেও বাজারে গতি ফিরছে না কেন?
সোমবার (৩ আগস্ট) ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১,২১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। কিন্তু একই দিনে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স (DSEX) ১০.০৯ পয়েন্ট কমে ৫,৮৮৫.৬৯ পয়েন্টে নেমে আসে। পাশাপাশি ডিএসইএস (DSES) সূচক ৬.১৩ পয়েন্ট এবং ডিএস৩০ (DS30) সূচক ৯.১৬ পয়েন্ট হারায়।
দিনের শুরুতে আশার আলো, শেষভাগে বিক্রির চাপ
লেনদেনের শুরুতে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। একপর্যায়ে ডিএসইএক্স সূচক ৫,৯২০ পয়েন্ট স্পর্শ করে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। দুপুরের পর সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই চাপ কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শেয়ারে দ্রুত দর বেড়েছে, সেসব শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতা (Profit Booking) দিনভর সূচকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
লেনদেন বাড়লেও কেন নেই বাজারজুড়ে গতি?
সাধারণত লেনদেন বৃদ্ধি বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সোমবারের চিত্র ছিল ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোট লেনদেনের বড় অংশ সীমিত কয়েকটি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলে বাজারের অধিকাংশ খাতে সেই তারল্যের ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
অন্যদিকে, ১৬৫টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও ১৬৯টির দর কমেছে, যা বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার টানাপোড়েনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অর্থাৎ লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও সেটি বাজারের বিস্তৃত অংশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ব্লু-চিপ শেয়ারের দুর্বলতা বাড়িয়েছে চাপ
দিনভর বড় বাজারমূলধনী বা ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর ওপর বিক্রির চাপ ছিল স্পষ্ট। এর ফলে ডিএস৩০ সূচক তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়ে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্লু-চিপ শেয়ারে শক্তিশালী ক্রয়চাপ না ফিরলে প্রধান সূচকে টেকসই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হওয়া কঠিন।
সেক্টর রোটেশন, তবে নতুন অর্থের প্রবাহ সীমিত
বর্তমানে বাজারে এক সেক্টর থেকে অন্য সেক্টরে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা দেখা গেলেও নতুন অর্থের প্রবাহ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। ফলে একটি খাত সক্রিয় হলেও অন্য খাতে বিক্রির চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে বাজারকে স্থিতিশীল ঊর্ধ্বমুখী হতে দিচ্ছে না।
একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতিও বাজারে ইতিবাচক গতি সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা কী দেখছেন?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেবল লেনদেনের অঙ্ক দেখে বাজারের শক্তি বিচার করা ঠিক নয়। প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে অ্যাডভান্স-ডিক্লাইন অনুপাত, সেক্টরভিত্তিক অংশগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্রয়-বিক্রয় প্রবণতা, বাজারের গভীরতা ও তারল্য এবং লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে সূচকের সামঞ্জস্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।
তাদের মতে, উচ্চ লেনদেন তখনই ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন তা বাজারজুড়ে বিস্তৃত অংশগ্রহণ, মৌলভিত্তির শেয়ারে শক্তিশালী ক্রয়চাপ এবং সূচকের টেকসই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে।
সামনে কী দেখবেন বিনিয়োগকারীরা?
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক কার্যদিবসে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, ব্লু-চিপ শেয়ারের গতিপ্রকৃতি এবং বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রবাহ কোন দিকে যায়, সেটিই বাজারের পরবর্তী দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।