অর্থ লিপি

৫ জুন ২০২৬ শুক্রবার ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

একজন সাবিত্রীবাঈ থেকে আমরা কতটা এগিয়েছি ?

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

উনিশ শতকের প্রথম দিকের কুসংস্কারে মোড়া রক্ষণশীল সমাজ। জাত-পাত, বর্ণ-ভেদের মত কুপ্রথা দিয়ে মাকড়সার জালের মত আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সমাজ। একমাত্র ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কারো পুঁথিগত শিক্ষালাভের কোন সুযোগ ছিল না। আর নারীরা তো ধুর ছাই… নারীদের জগত অন্দরমহল পর্যন্ত অর্থাৎ রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর- এটাই ছিল নারীদের দৈনন্দিনের যাতায়াত। সেই সময়ের একজন আলোকিত মানুষ- সাবিত্রীবাঈ ফুলে (১৮৩১-১৮৯৭)।

ঘর থেকে বের হলেই সমাজের লোকেরা যাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিত। কেউ বা ইট, কাঠের টুকরো ছুঁড়ত। কেউ বা গোবর কাদামাটি ছুঁড়ে তাকে অপদস্ত করার চেষ্টা করতো। কি ছিল তার অপরাধ? তার আসল নাম সাবিত্রী পাতিল। জন্ম মহারাষ্ট্রের এক মালি পরিবারে। মাত্র নয় বছর বয়সে বিয়ে হয় তের বছর বয়সী জ্যোতিবা ফুলের সঙ্গে। বিয়ের পরে দেখতেন তার স্বামী লুকিয়ে লুকিয়ে লেখাপড়া শিখছেন।

তারও ইচ্ছে হলো লেখাপড়া শেখার। স্বামীর সহযোগিতায় তিনি অক্ষর জ্ঞানের প্রথম পাঠ নিলেন। বই পড়তে পারেন, লিখতেও পারেন। এমন সময় সমাজে জানাজানি হয়ে গেল তাদের লেখাপড়ার কথা। প্রতিবেশীরা এসে ছ্যাঃ ছ্যাঃ যাচ্ছে তাই বলতে শুরু করলো। জ্যোতিবা ফুলের বাবা ছেলেকে পড়ালেখা বন্ধ করতে বললেন। কিন্তু জ্যোতিবা নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

এ নিয়ে সমাজপতিরা তাদের পরিবারকে একঘরে করার সিন্ধান্ত নেয়। এমতাবস্তায় জ্যোতিবা ফুলের বাবা তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কিশোর দম্পতি কোথায় যাবে? এসময়ে তাদের তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় উসমান শেখ। তিনি জ্যোতিবা ও সাবিত্রীবাঈকে তার ঘরে আশ্রয় দেন।

উসমান শেখ এর বাড়ির আঙ্গিনায় তারা দলিত- পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য শিক্ষাদান পাঠকেন্দ্র খোলেন। নিজেরা যেটুক্য শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, সেটুকুই অন্যদের শেখাতে শুরু করলেন। তখনও মেয়েরা ও পাঠদান কেন্দ্রে আসেন নি। কিন্তু উসমান শেখের বোন ফাতিমা শেখ তাদের কাছে পড়তে শুরু করলেন।

এরপরে ফাতিমা শেখকে সাথে নিয়ে সাবিত্রীবাঈ বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। পথের মধ্যে তাকে শুনতে হতো কটু কথা। ছুড়ত ঢিল, কাদা, গোবর… তিনি থেমে যান নি। ব্যাগের মধ্যে একখানা অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে বের হতেন। যারা সে সময়ে অস্পৃশ্য ছিল তাদের মহল্লায় গিয়ে কাপড় বদলে হাত মুখ ধুয়ে তারপরে তাদের পড়াতেন।

এভাবেই কেটে গেছে বহু বছর। এরই ফাঁকে তিনি মিশনারী স্কুল থেকে শিক্ষকতার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। রপ্ত করেছেন ইংরেজী ভাষাও। স্বামী-স্ত্রী মিলে একে একে প্রতিষ্ঠা করেছেন আঠারোটি স্কুল।

উল্লেখ্য, সে সময় মিশনারীদের পরিচালিতে স্কুলের চেয়েও তাদের পরিচালিত স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশী ছিল। ১৮৫২ সালে বৃটিশ সরকার তাদের সংবর্ধনা দেন। শুধুমাত্র শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়। সমাজের বিভিন্ন অসংগতির বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নিয়েছেন। কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, গণসচেতনা বৃদ্ধিতে চালিয়েছেন প্রচার প্রচারণা।

সে সময়ে বাল্যকালেই বেশীরভাগ মেয়েদের বিয়ে হতো, বয়সে অনেক বড় পুরুষের সাথে। ফলে বালিকা বয়েসে বহু নারীকে বিধবা হয়ে, মাথা কামিয়ে ব্রহ্মচর্য্য পালন করতে হতো। ১৮৫২ সালে সাবিত্রীবাঈ নারীর সম্মান ও মানবিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শুরু করেন আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহিলা সেবা মন্ডল’ একটি প্রতিষ্ঠান।

কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজে অকাল বৈধব্যের শিকার নাবালিকা মেয়েরা ছিল অসহায়। সে যুগে সদ্য বিধবা নারীদের চুল কেটে ফেলা হতো। এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেন সাবিত্রীবাঈ এবং ধর্মঘটের ডাক দেন। মহারাষ্ট্রের ক্ষৌরকর্মীরা আহ্বানে সাড়া দেন এবং চুল না কাটার প্রতিজ্ঞা করেন। এসব বিধবা নারীদের একটি বড় অংশ পরিবারের সদস্য অথবা প্রতিবেশীদের যৌন নিগ্রহের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়তো; তারা মানসম্মান বাঁচাতে হয় তারা ভ্রুণ হত্যা করতে হতো, নয় তারা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতো। এসব নাবালিকা বিধবাদেরদের দুঃখে তিনি ব্যথিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভ্রূণ হত্যা’ প্রতিরোধ সংস্থা। ১৮৬৩ সালে গর্ভবতী বাল্যবিধবা ও ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী বালিকাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ‘বালহত্যা প্রতিবন্ধক গৃহ‘(Home for prevention of infanticide) প্রতিষ্ঠা করেন।

এই ঘরে ধাত্রীমায়েরা সন্তান প্রসব করাতেন। যারা সন্তান নিয়ে আর ঘরে ফিরতে পারতেন না, তারা সন্তানদের এখানেই রেখে যেত। এই বাল্যবিধবাদের পিতৃপরিচয়হীন সন্তানদের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সাবিত্রীবাঈ। ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হলেও, মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় টিকে ছিল বর্বর সতীদাহ প্রথা।

ব্রাহ্মণের তৈরি কুসংস্কারযুক্ত বিধান, লিঙ্গ ও বর্ণবৈষম্য বিরুদ্ধে এবং সমাজে পিছিয়ে থাকা মানুষদেরকে শোষণের হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সত্য শোধক সমাজ’। তার সঙ্গে ছিলেন স্বামী জ্যোতিরাও ফুলে। তার ‘সত্য সাধক সমাজ’ এ যোগ দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ- অব্রাহ্মণ হিন্দু, মুসলিম, সরকারি আধিকারিকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এই সত্য শোধক সমাজকে সাথে নিয়ে, সাবিত্রীবাঈ লড়াই শুরু করেছিলেন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে।

১৮৭৪ সালে কাশিবাই নামের একজন ব্রাহ্মণ বিধবার সন্তানকে সাবিত্রীবাঈ দত্তক নেন। দত্তকপুত্র যশবন্ত রাওকে লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার তৈরি করেছিলেন। বিয়ে দিয়েছিলেন এক বাল্য বিধবার সঙ্গে। বিয়ের আগে ভাবী পুত্রবধুকে নিয়ে এসেছিলেন নিজের বাড়িতে। যাতে নতুন পরিবারে পুত্রবধু মানিয়ে নিতে পারে। সংসারের কাজ থেকে পুত্রবধুকে দূরে রেখেছিলেন, যাতে সে পড়াশুনা বিঘ্নিত না হয়।

১৮৭৬ সাল ভারত জুড়ে শুরু হয়েছিল অতিমারী দুর্ভিক্ষ। সাবিত্রীবাঈ তার স্বামী ও পুত্রকে নিয়ে, রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতে শুরু করেছিলেন আশেপাশের এলাকার ভুখা মানুষদের বাড়িতে। এছাড়াও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে খুলেছিলেন প্রায় বাহান্নটি লঙ্গরখানা।

১৮৯০ সালে ২৮ শে নভেম্বর জ্যোতিবা ফুলের মৃত্যুর পর সামাজিক প্রথা ভেঙে স্বামীর শবযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাবিত্রীবাঈ। নিজের মাথায় করে বয়েছিলেন স্বামীর অস্থিকলস। সেদিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য অবলোকন করেছিল রক্ষণশীল সমাজ। সেদিন তার দিকে কাদামাটি, গোবর ছোঁড়ার মতো সাহস করেনি কেউ।

তিনি আধুনিক মারাঠি কবিতার পথিকৃত হিসেবেও পরিচিত। নারী শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বিষয়ে লিখেছেন অনেক কবিতা। তার দুইটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে একটি ‘কাব্যফুলে’ ১৮৫৪ সালে অন্যটি হলো ‘ভবন কাশি সুবোধ রত্নাকর’ ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয়।

১৮৯৭ সালে তৃতীয় বিউবনিক প্লেগ মহামারী্তে আক্রান্ত পুনে। পুত্র যশবন্তকে নিয়ে সাবিত্রীবাঈ একটি চিকিৎসা কেন্দ্র খুলেছিলেন। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে সাবিত্রীবাঈ ও যশবন্ত প্লেগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে আসতেন চিকিৎসা কেন্দ্রে এবং চিকিৎসা করতেন। রাতদিন প্লেগ আক্রান্তদের সেবা করতে করতে নিজেই আক্রান্ত হন, ১০ই মার্চ ১৯৯৭ সব চেষ্টা বিফল করে মাত্র ৬৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এটুকুই শেষ নয়। এটা সংক্ষিপ্ত আকারে লিখলাম, এই মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে কয়েকটি বই হয়ে যাবে। ঘুণেধরা পৈশাচিক বর্বর সমাজের ভীত নাড়িয়ে দিয়ে এবং সভ্যতার বাতি জ্বালিয়ে তিনি চলে গেছেন দূরে।

আজও সেই দূরের আলোয় আলোকিত হয়ে বেঁচে আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারী। তারপর ১২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা স্কুলের চৌকাঠে পা রেখেছি, এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সময়ে জ্যোতিবা বা সাবিত্রী না জন্মগ্রহণ করলে আজও আমরা পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম কিনা সন্দেহ!

লেখাপড়া শিখে এগিয়ে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থায়ও আমাদের (নারী) মানবিক অধিকার আদায়ের জন্য লড়তে হচ্ছে, এ লজ্জা কোথায় রাখি! মহীয়সী সাবিত্রীবাঈ ফুলে বেঁচে আছেন আমাদের অন্তরে।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।