পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির প্রায় ১০২ কোটি টাকার শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটির শেয়ার ধারণের নির্ধারিত সীমা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ আইনি ছাড় পাওয়ার পরপরই এ ঘোষণা এসেছে।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে শেয়ার কেনার এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, শরীফ জহিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি ইউসিবির ৮ কোটি ২০ লাখ শেয়ার কিনবে। অন্যদিকে, তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপর প্রতিষ্ঠান জে অ্যান্ড জে ইন্টিমেইটস কিনবে ৩ কোটি শেয়ার। দুই প্রতিষ্ঠান মিলে মোট ১১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে।
আজকের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ঘোষিত শেয়ারগুলোর মূল্য প্রায় ১০১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই শেয়ার ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৪ দশমিক ৮২ শতাংশের সমান।
আইনি ছাড়ের পর শেয়ার কেনার ঘোষণা
উল্লেখ্য, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংক ইউসিবিকে বিশেষ আইনি ছাড় দেয়। এর আওতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ক(১) ধারার বিধান ব্যাংকটির ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়।
ওই ধারায় সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এককভাবে কিংবা যৌথভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের ওপর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিধান থেকে ইউসিবিকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার পরই ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ঘোষণা সামনে আসে। ফলে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামো ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে এ বিনিয়োগের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইউসিবির মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউসিবি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, তাঁর ভাই, স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার ছিল।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ধারণ করা শেয়ারের পরিমাণ কমে প্রায় ১০.২৭ শতাংশে নেমে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এখন শরীফ জহিরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে শেয়ার কিনলে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের অংশীদারত্ব বাড়তে পারে।
মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় ইউসিবি
একদিকে উদ্যোক্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নতুন করে শেয়ার কেনার ঘোষণা এসেছে। অন্যদিকে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় রয়েছে ইউসিবি।
ব্যাংকটি প্রায় ৭৭ কোটি ৫০ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৭৭৫ কোটি টাকার বেশি মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্যাংকের ভিত্তি শক্তিশালী করতেই বিনিয়োগ: শরীফ জহির
শেয়ার কেনার ঘোষণা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে শরীফ জহির জানান, আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটির ভিত্তি মজবুত করতে উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁরা নিজেরাই আগে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটিকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পর দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। উদ্যোক্তারা আগে বিনিয়োগ করে ব্যাংকটিকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারলে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যেদিকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ আইনি ছাড়, চেয়ারম্যানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের শেয়ার কেনার ঘোষণা এবং রাইট শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ, সব মিলিয়ে ইউসিবিকে ঘিরে পুঁজিবাজারে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে ঘোষিত শেয়ার কেনার কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং এই বিনিয়োগ ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী বাস্তবায়ন ও আর্থিক ফলাফলের ওপর। বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই শেয়ার কেনার ঘোষণা, প্রকৃত লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য এবং ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অগ্রগতি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।