অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল
শুধু সংগীতের জন্যই এ জীবন। সংগীতের জন্যই বাঁচতে চেয়েছিল সে। আমাদের জীবন ধারনের জন্য অর্থের উপার্জন দরকার। নিজের প্যাশানকে টিকিয়ে রাখতে জীবিকার প্রয়োজনে নেশা আর পেশাকে সে এক করে দিয়েছিলে। কিন্তু সে অর্থে সেই অর্থ কখনোই তার পর্যাপ্ত ছিল না। তবুও শুধু সংগীতকে ভালোবেসে তার মধ্যেই বিচরণ করবে বলে, চাকুরীকে কখনোই পছন্দ করেনি। তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলে শুধুই সংগীতের জন্যই। তিনি আর কেউ নয় সোনারপুর কামরাবাদ অঞ্চলের মন্দিরতলার নিবাসী কামরাবাদ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের প্রয়াত শিক্ষক মানস দে’র জেষ্ঠ পুত্র সংগীতশিল্পী ‘সৌম্যকান্তি দে’, ওরফে আমাদের সকলের প্রিয় ‘বুবলা’।
আমার থেকে বয়সে সম্ভবত এক থেকে দের বছরের ছোট। আমাদের মধ্যে দাদা ও ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল। সেই পারস্পরিক সম্পর্ক এতটাই শ্রদ্ধার ছিল যেখানে গভীর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওর সাথে দেখা হলেই আমাদের কথা যেন ফুরোত না। দুজনার ফ্রিকোয়েন্সি এতটাই ম্যাচ করত যেখানে হাজার ভিড়ের মধ্যেও চোখাচোখি দেখা হলেও আমাদের শরীরী ভাষা ক্রমশ কথা বলতো। হাজার ব্যস্ততা থাকা স্বত্বেও রাস্তাঘাটে যেখানেই দেখা হলে দুদণ্ড কথা শেয়ার না করে যেতে পারতাম না। প্রতিনিয়ত সম্পর্কের বাঁধন বাঁধতে আলাপচারিতায় এভাবে কত সময় পেড়িয়ে গেছে নিজেরাই টের পাইনি।
একদিন কথায় কথায় উঠে এলো – জীবন আর জীবিকার বিষয় নিয়ে। এই পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ আছে যেখানে রাষ্ট্রই নাগরিক ও সমাজ জীবনের দায় নেয়। অথচ আমরা এমন এক দেশে জন্মেছি যেখানে নাগরিকের আর্থসামাজিক পরিকাঠামোয় দায় নিজেকেই নিতে হয়। আমাদের প্যাশান যদি হয় জীবন, আর অর্থ উপার্জন হল জীবিকা; সেখানে আমাদের মতো দেশে এই মেলবন্ধন অনেকক্ষেত্রেই ঘটে না। তাই এদেশের অনেক প্রতিভাই অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যায়। সেদিন ওকে বলেছিল -“তোমাকে এত রেস্পেক্ট করি কেন জানো। খুব কাছ থেকে দেখেছি তোমায়। তুমি নেশা আর পেশাকে এক করতে পেরেছো। সত্যি বলতে কজন এটা পারে ! এইযে আমার মধ্যে লেখা আর আঁকার একটা প্যাশান, তাকে আমি কখনোই পেশায় পরিনত করতে পারিনি। আমার জীবিকাকে অন্য এক পরিসরে খুঁজে নিতে হয়েছে। অথচ তুমি সেটাই করে দেখালে। এর জন্য তোমার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও সম্মান সব সময়ই বেড়ে গেছে।”
শৈশব থেকেই সোনারপুরের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সরাজ রায়ের ও প্রিয় ছাত্র ছিল। পরবর্তীকালে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদ বা গুরুদের কাছ থেকেও বিশেষভাবে তালিম নিয়ছিল। কামরাবাদ তথা সোনারপুর অঞ্চলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিল সৌম্যকান্তি দে। আশৈশব নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গীত সাধনায় ব্রতী এক অনন্য সুরসাধক। যাঁর কণ্ঠে’র যাদু আর সুরের মায়াবী মুর্ছনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল কাছে ও দূরের সঙ্গীতপ্রেমী জনতা। ও এমন একজন ব্যক্তি ছিল শুধু সংগীতশিল্পীই নয়, নিজেকে একজন গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও চিহ্নিত করেছিল। ও একজন বড় সঙ্গীত শিক্ষক এবং অসম্ভব – ভালো হারমোনিয়াম বাদক শিল্পী !
এছাড়াও ‘বুবলা’ ভালো সংগঠক এবং সমাজসেবক।
বিভিন্ন দূর্যোগ পীরিত মানুষের পাশে সব সময়ই ছুটে যেতে দেখেছি। আরেকটি ওর ভালো দিক ছিল সেটি হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ের ওপর ওর অসাধারণ লেখনী ক্ষমতা। লেখার হাত ছিল তুলনাহীন। ছোট্ট পরিসরেও তার অসাধারণ ব্যাপ্তি। প্রতিটি লাইনের ভেতর কি আন্তরিক শব্দের মোচড়। পরিচিত মানুষের স্মৃতিচারণ হোক অথবা যেকোন বিষয় ভিত্তিক আলোচনা যেমনই হোক না কেন তার প্রতিটি লেখনীর মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান দেওয়া থাকত, যা মানুষের কাছে সেই লেখার অসম্ভব এক গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হত। ওর লেখার বিষয়ের মধ্যে কি ছিলনা – আর্থসামাজিক পরিকাঠামো, রাজনৈতিক মতাদর্শ, খেলাধুলা, আঁকা, নৃত্য, নাটক, সিনেমা, থিয়েটার, যন্ত্রসংসীত ও সর্বোপরি সংগীত। সমাজের সমস্ত বিষয় ছুঁয়ে যেত ওর লেখায়। এই সমস্ত বিষয়ের ব্যক্তিত্বের ওপর ওর মূল্যায়ন ও আলোকপাতের চিত্রায়ণ ছিল অসাধারণ। অর্থাৎ দর্শণ। দর্শণ কথার অর্থ হল দেখা। এই দেখার ভিন্নতা এক একজন মানুষের এক এক রকম। বুবলা দেখতো ভেতর থেকে। যা প্রকাশ্যে দেখা যায় না। অন্তর দৃষ্টিতে তা উপলব্ধি করতে হয়। সেই দর্শন বা ফিলোজপি ওর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সেই লেখার মধ্যে সমাজের বিশিষ্ট জন থেকে শুরু করে একেবারে সমাজ জীবনের অতি সাধারণ মানুষের কথাও বারবার ধরা থাকত। একদিন বুবলাকে বলেছিলাম – “তুমি যে এত প্রবন্ধ আর নিবন্ধ লিখছো, সেটার মূল্য কিন্তু অপরিসীম। সেগুলো সব জমা করে রেখো। একদিন বইয়ের আকারে প্রকাশ করতে হবে।”
– “কি যে বল! ওগুলো কি সত্যিই লেখা ? তোমাদের মতো লেখালেখি জগতের লোক নই। কিছু কিছু ভাবনা মাথায় আসে তাই ফেসবুকে লিখে ফেলি।”
– “না না, ওগুলো সত্যিই ভালো লেখা। মানুষের মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এটাই’ত সাহিত্য। তবে আজ একটা তোমায় প্রশ্ন রেখে যেতে চাই – এই যে এত মানুষের কথা লিখে যাচ্ছো, কিন্তু এমন একটা দিন আসবে – অমোঘ নিয়মে যা চিরসত্য ! সেইদিন তোমার কথা লিখবে কে ? বলবে একবার!” এ কথা শুনে শিশুর মতো অনেকক্ষণ হেসেছিল। হাসি থামতেই বলে উঠল – “কেন তুমি লিখবে না, হরিশঙ্করদা ?” আবারও হাসি। সেই অনাবিল নিষ্পাপ হাসির দোলায় মন্দির সংলগ্ন জলাশয়ে মৃদুমন্দ কম্পাঙ্কে এক একটা বৃত্ত অনুভূত হচ্ছিল। বেলাশেষের পশ্চিম আকাশের লাল আভার প্রতিবিম্বে সেই বৃত্তগুলো যেন যে যার অবস্থান তৈরী করছিল। আর বারংবার সেই একটি কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল – “কেন তুমি লিখবে না, হরিশঙ্করদা ?”
কিংবদন্তি শিল্পী সংগীত সম্রাট প্রয়াত মান্না দে’র একনিষ্ঠ ভক্ত ছিল ও। তার সামনে তারই গাওয়া গান গেয়ে তাকে শুনিয়েছিলেন বুবলা। ওর এই অসাধারণ গায়কী ঢং মান্না দেকে খুশি করেছিল এবং উনি সেটা তারিফ করেছিলেন। সঙ্গীতের প্রতি ওর নিবেদিত প্রাণ। মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে মহম্মদ রফি, কিশোর কুমার রাহুলদেব বর্মন, উত্তম- সৌমিত্র থেকে বম্বের তাবড় চলচ্চিত্র নায়ক দিলীপকুমার,অমিতাভ বচ্চনের অসম্ভব গুণগ্রাহী। এমনকি খেলার মাঠের নায়কদের নিয়েও ওর অসম্ভব শ্রদ্ধা ছিল। যা কিনা তাঁর লেখায় বারংবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার অকৃত্রিম অনুভূতি ও প্রগাঢ় দায়বদ্ধতা। তাই গড়ে তুলছিলেন ‘প্রবোধ-পঞ্চম’ সঙ্গীত একাডেমি। যেখানে প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করা হত নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের। সেই গাছকে লালিত পালিত করে ছোট্ট কুড়ি থেকে প্রস্ফুটিত করা হত অসংখ্য স্বনামধন্য গায়ক-গায়িকাদের।
এবছর দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে ভাইপোর(বিট্টু) থেকে খবর পেলাম বুবলার শরীরটা ভালো নেই। প্রথমে একদিন বুকে ব্যাথায় কষ্ট পাচ্ছিল। গ্যাসের ব্যাথা ভেবে লোকাল ডাক্তার। তেমন কিছু হলোনা। এরপর পিয়ারলেস হসপিটাল ভর্তি। নানান পরীক্ষা নিরিক্ষা পর কিডনির রক্ত ক্ষরণ এবং অবশেষে জানা গেল ক্যানসারে আক্রান্ত। ততদিনে সংক্রামণ বেড়ে গিয়ে একেবারে হার্ট পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। হার্টের সমস্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। পিয়ারলেস হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হল টাটা ক্যানসার হসপিটাল। সেখানেও আরো এক প্রস্ত পরীক্ষা নিরিক্ষা হল। আশার আলো দেখা গেল না। রায় দিয়ে দিল একেবারে লাষ্ট স্টেজ। ওখানে ওরাল থেরাপি করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল।
ক্রমশ শারীরিক অবস্থা ডিটোরেট করতে থাকে। তবুও ওর মনের জোর অসম্ভব ! বাড়িতে আবারও ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে গানের ক্লাস বসলো কয়েকদিন। পাড়ার ক্লাবের দুর্গা পুজোর মণ্ডপে এসে একদিন সন্ধ্যায় বসলো। ভাবলাম বুঝি লড়াই জারি থাকবে। কিন্তু ভেতর ভেতর ও যে একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। মেডিক্যাল বিষয়ে এক্সপার্ট তড়িৎ চক্রবর্তী ওরফে সাহেবদার সাথে ওর বিষয়ে কথা হচ্ছিল, তখনই আমরা বুঝেই গিয়েছিলাম ওর আর আমাদের মধ্যে বেশি দিন নেই। আমি, সাহেবদা আর আমার ভাইপো বিট্টু প্রাথমিক একটা আলোচনা করে ওর জীবদ্দশার মধ্যেই ওকে একটা সংগীতশিল্পীর সম্মান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। সেইমতো অনেকটা কাজও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।
ভাবনা ছিল – আমরা সাংস্কৃতিক প্রেমী মানুষেরা ওর বাড়িতে গিয়ে একদিন ওর হাতে সেই সম্মান তুলে দিয়ে আসবো। আমরা স্বপ্ন দেখছিলাম আবেগ প্রবণ বুবলা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠবে। সবাইকে ডেকে বলবে – “গেঁওযোগী ভিখ পায়না, এ প্রবাদ একেবারে মিথ্যে! এই দ্যাখো দ্যাখো আমার কাছের মানুষের দেওয়া এই সম্মান, কেমন উজ্জল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে !” কিন্তু আমাদের এ স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল! বাধা পড়ল ২০-১১-২০২৩, সোমবার সকাল ৭-৪৫ এ সাহেবদার একটা ফোনে, সবে রাইফেল ফ্যাক্টরী ইছাপুরের অফিসে ঢুকেছি। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল কন্ঠস্বর – “মনু আমরা আর কাজটা করে উঠতে পারলাম না। আমাদের ভাবনাটা অধরাই থেকে গেল। আজ ভোরে ঘুমের মধ্যে বুবলা সবকিছু ছেড়ে চলে গেল !!”
খবরটি শুনেই বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠল।মাত্র ৫৩ বছর বয়সেই নিভে গেল তার জীবন প্রদীপের উজ্বল শিখা। বললাম – “এ খবর কেন মিথ্যে হয়না ? সাহেবদা !”
– “মৃত্যুই ‘তো স্বাশত সত্য ! তাকে মিথ্যে বলি কি করে!”
প্রতিদিনের মতো আজ আর ও ঘুম থেকে উঠল না! চিরঘুমের দেশে চলে গেল। ভোরের রেয়াজে ভৈরবী আলাপ গেল থেমে। আজ কি সত্যি সত্যিই আঁধার ফোটার সাথে সাথে পাখিরা কিচিরমিচির করেনি! কোন এক নিষ্ঠুর ভোর থেকে এমন সকাল ফুটলো! মনের ভেতর কেবলই জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সেই গান ভেসে আসছে – “এ কোন সকাল রাতের চেয়ে অন্ধকার – – – ”
অনেকক্ষণ কেউ আর কোন কথা বলতে পারিনি। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল এত তাড়াতাড়ি কেউ যায়! ওর’তো এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে! আজ বড় মনে পড়ছে সেই শৈশবের কথা যখন ১৯৭৫ সালে বেতারে (রেডিও) গল্পদাদুর আসরে শিশু সংগীতশিল্পী হিসেবে সৌম্যকান্তি দে (বুবলা)’র গাওয়া গান। তখন ওর বয়স কত আর হবে – বড়জোর ছয় কি সাত। আমরা তখন প্রাইমারি সেকশনে পড়াশোনা করি। ও সম্ভবত আমার থেকে এক ক্লাশ নীচে পড়ে। পরদিন মন্দিরতলার ওদের একান্নবর্তী দালান বাড়িতে কামরাবাদের প্রচুর মানুষ ভিড় জমিয়েছিল ওকে দেখার জন্য। আরো মনে পড়ে ১৯৭৬ সালে দূরদর্শণের পর্দায় যেদিন প্রথম ওকে দেখেছিলাম বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সংগীত নির্দেশক অভিজিৎ ব্যানার্জীর পরিচালনায় সমবেত শিশুশিল্পীদের নিয়ে দুটি সংগীত পরিবেশিত হয়েছিল। একটি অতুল প্রসাদের গান এবং অপরটি চারণ কবি মুকুন্দ দাসের গান ছিল।
সেই দলে সোনারপুরের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সরাজ রায়ের ১০ জন প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী ছিল। তার মধ্যে আরেকজন আমার খুবই পরিচিত সংগীতা মল্লিক (গীতু) ছিল। সেই সময় সোনারপুরে বৃহত্তর কামরাবাদ অঞ্চলে হাতে গোনা দুই তিনটে বাড়িতে সবে টেলিভিশন এসেছে। সেই সময় গীতুর বাবা সনথ মল্লিকের কাছে আমি তবলার তালিম নিতে যেতাম। সেই সূত্রে কলকাতা দূরদর্শণের(DD বাংলা) সেই সম্প্রচারটি দেখার জন্য সংগীতা মল্লিকের বাড়ির সকলের সাথে আমিও ওর বাবার বন্ধু মুন্না কাকুর বাড়িতে (সোনারপুর কারশেডের কাছে) গিয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকে পরিচিত মানুষের কাছে বুবলা ও গীতুদের মাইলেজ অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। তারপরে কত অনুষ্ঠানে ওর অংশগ্রহণ দেখেছি। সেইসব অনুষ্ঠানের সঞ্চালকরা বেতার ও দূরদর্শণ শিল্পী বলে ওকে সম্মান দিত। সেসব দিনের কথা আজ ইতিহাসের পাতা থেকে স্মৃতি খনন করে তুলে আনছি।
কিছুতেই অফিসে মন বসছে না। অফিস হাফ ছুটি করে বেড়িয়ে পরলাম। সোজা চলে গেলাম সোনারপুরের ঝিলপার্কে ওদের নতুন বাড়িতে। রাস্তা ও বাড়ির উঠোনে লোকে লোকারণ্য। অথচ দোতলা বাড়ির নীচতলার বারান্দায় শীতল কাচের জারের ভেতর চির শায়িত বুবলা, যেন নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে । ওর একমাএ আদরের ভাই টুবলা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামশেদপুর থেকে আরো ভেতরে একটি মাইনে কর্মরত। খবর পেয়ে ওখান থেকে আসবে। সেই অপেক্ষায় আছে সবাই। ওর আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে গেল। পশ্চিম আকাশের লাল আভায় রাঙিয়ে উঠেছে দিক দিগন্ত। ওর মতাদর্শের কাছে প্রকৃতিও এসে রক্তিম অভিনন্দন জানাচ্ছিল। তখনই অশ্রুপ্লাবনে ভেসে যাচ্ছে সমবেত জন সমাগম।
অবশেষে অন্তিমযাত্রা শুরু হল। প্রথমেই কামরাবাদ মন্দিরতলার পুরনো সেই বনেদী বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল ওকে। এ বাড়িতে তার আজীবন শৈশব কেটেছে। এ বাড়ির উঠোনে খেলা করেছে, অলিন্দে ছোটাছুটি করেছে, খিলানে ও থামের গায়ে হেলান দিয়ে গুন গুন করে কত গান গেয়েছে, দোতালার বারান্দায় সংগীতের দরবার বসেছে আর চিলেকোঠার নিরালা দুপুর থেকে শেষ বিকেলের চালচিত্রে ক্রমশ বেজে উঠেছে সমস্ত রাগ রাগিনিগুলো । ওর এই ৫৩ বছরের জীবদ্দশার আশি শতাংশ সময়ই কেটেছে এ বাড়িতে। ভগ্ন প্রায় এ বাড়িতে এখন একমাএ ছবি পিসিই থাকে। সবচেয়ে আদরের সন্তানসম ভাইপোর এই অকাল প্রয়াণ সে কিছুতে মেনে নিতে পারছে না। এমত অবস্থায় তাকে সামলাবে কে! তাই আজ আর সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালা হল না।
এরপর ওর নিথর নিয়ে আসা হল ওর প্রাণের ক্লাব কামরাবাদ তরুণ সংঘে । যেখানে বিভিন্ন সময় সংস্থার বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেছে। বুবলাকে শেষ দেখবার জন্য মানুষের ঢল নেমেছে ক্লাবের মাঠে। শবযাত্রার কাচের সেই গাড়ি থেকে নামানো হল দেহ। শায়িত করা হল ক্লাবের মূল মঞ্চের বেদিতে। প্রথমেই ওর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল। সংঘের কার্যকারি সমিতির পদাধিকারী সদস্যরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন। এরপর এক এক করে সোনরপুর অঞ্চলের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা ফুল রাখলেন তার দেহে। এইবার মহাপ্রস্থানের যাত্রা। তাই তার অন্তিম শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল রাজপুর মহাস্মশানের দিকে।
স্মশানে পৌঁছেই একেবারে ফাঁকা পেয়ে গেলাম। ইলেক্ট্রিক চুল্লীর ভেতরে ততক্ষণে একটি বডির দাহ শেষ হতে চলেছে। তাই লাইনও পেয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি! একটি বডির দাহ শেষ হতেই – চুল্লীর মুখটা খুলে গেল। টলি করে বুবলাকে ঢুকিয়ে দিতেই আগুনের রাক্ষসটা দাউ দাউ করে ওকে গিলে নিল। এ জীবনে এত তাড়া ছিল তোমার? সবকিছুতেই তোমার বড় তাড়া! এখন চুল্লীর ভেতর ও পুড়ে পুড়ে ছাই হচ্ছে। সময়ের অপেক্ষায় স্মশান চত্বরে আমরা ইতস্তত বসে আছি। মাথার ওপর ঝলমলে তারার আকাশ। সেই তারাদের ভিড়ে খুঁজছিলাম কোনটা সৌম্যকান্তি ! এ জীবনে আমাদের মতো তোমার তো তেমন কোন চাহিদা ছিলনা। সৌম্যকান্তি শুধু সংগীতজ্ঞ হতে চেয়েছিল! যেমন – অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!