অর্থ লিপি

২৬ জুন ২০২৬ শুক্রবার ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

নরক ভূমি হতে নরক নগরী’তে: আসাদুজ্জামান মানিক

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “অর্থ লিপি.কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  www.facebook.com/OrthoLipi

নরক কেবল মৃত্যুর ওপারের কোনো পৌরাণিক অগ্নিকুণ্ড নয়; নরক আমাদের চারপাশ, আমাদের যাপিত জীবন, আমাদের অবচেতনের এক পচনশীল বাস্তবতা। টিএম মিলজার হোসেনের লেখনীতে এই নরকের যে বিস্তার, তা কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রার ধারাবাহিকতা।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নরকভূমি’ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নরক নগরী’ পর্যন্ত বিস্তৃত এই যাত্রাপথ আসলে মানবসত্তার ক্রমিক ক্ষয়ের এক পরাবাস্তব দলিল।

অনেকেই হয়তো প্রথম কাব্যগ্রন্থটি এড়িয়ে সরাসরি ‘নরক নগরী’র কংক্রিটের জঙ্গলে প্রবেশ করতে চাইবেন। কিন্তু পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটি কথা আমি খুব স্পষ্ট করেই বলতে চাই— ‘নরক ভূমি’র ধূলি ধূসর, আদিম দহন অনুভব না করে ‘নরক নগরী’র যান্ত্রিক গোলকধাঁধায় পা রাখাটা একেবারেই অসম্পূর্ণ এক পাঠ-অভিজ্ঞতা। কারণ, মাটির ভেতরের শেকড়ের পচন না দেখলে একটি মহীরুহের মৃত্যুযন্ত্রণা কখনোই পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না।

‘নরকভূমি’ হলো সেই আদিম প্রান্তর, যেখানে আমাদের অস্তিত্বের প্রথম সংকটগুলো অঙ্কুরিত হয়েছিল। সেখানে আছে ধুলো, ঘাম, এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোর এক নগ্ন, অকৃত্রিম প্রকাশ। ওই প্রান্তরটি ছিল আমাদের আদি পাপ, লোভ আর যন্ত্রণার চারণভূমি। কাব্যগ্রন্থটি পড়ার সময় আপনি অনুভব করবেন এক আদিম হাহাকার, অস্তিত্বের এক তীব্র সংকট— যা আমাদের সভ্যতার ছদ্মবেশের নিচে সবসময় চাপা পড়ে থাকে। সেখানে কোনো মেকি আবরণ নেই, আছে কেবল দগ্ধ হওয়ার সরাসরি অনুভূতি।

আর ‘নরক নগরী’? এটি হলো সেই আদিম ‘নরক ভূমি’র বিবর্তিত, সুসজ্জিত এবং নিখুঁত রূপ। যে আগুন ‘নরকভূমি’তে ছিল বন্য এবং অনিয়ন্ত্রিত, ‘নরক নগরী’তে এসে তা হয়ে উঠেছে সুপরিকল্পিত এবং নীরব এক ঘাতক। এখানে আদিম প্রান্তর রূপান্তরিত হয়েছে ইট-পাথর, লোহা আর কাঁচের এক বিষাদগ্রস্ত গোলকধাঁধায়। মানুষের বিচ্ছিন্নতা এখানে চরম। ‘নরক ভূমি’র খোলা মাঠের হাহাকার এখানে এসে আটকে পড়েছে বদ্ধ ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে, নিয়ন আলোর নিচে, পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক আগ্রাসনে আর নাগরিক ইঁদুর দৌড়ে।

প্রথম কাব্যগ্রন্থটি না পড়লে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটির গভীরতা আপনার কাছে কেবলই কিছু নাগরিক হতাশার বিচ্ছিন্ন চিত্র বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ‘নরক ভূমি’র পাঠ আপনাকে সেই তৃতীয় চোখটি দেবে, যা দিয়ে আপনি দেখতে পাবেন কীভাবে একটি পতিত জমি ধীরে ধীরে একটি অভিশপ্ত, দমবন্ধ করা নগরে রূপান্তরিত হয়। আপনি বুঝতে পারবেন, ‘নরক নগরী’র প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে, প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের ছায়ায় মিশে আছে ‘নরক ভূমি’র সেই পুরোনো রক্ত, ঘাম আর হাহাকার।
এই দুটি কাব্যগ্রন্থ আসলে একই সুতোর দুই প্রান্ত, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রথমটিতে আছে সৃষ্টির নামে ধ্বংসের বীজ বপন, আর দ্বিতীয়টিতে সেই বীজের মহীরুহ হয়ে ওঠার ভয়ংকর পরিণতি। জীবনের অন্ধকার এবং পরাবাস্তব দিকগুলোকে কবি এখানে এমন এক তীব্র ভাষায় তুলে ধরেছেন, যা আপনাকে স্বস্তির ঘুম থেকে টেনে তুলবে।

তাই, আমার পরামর্শ— আগে ‘নরকভূমি’র রুক্ষ মাটিতে পা রাখুন। সেখানকার আদিম উত্তাপ আর পোড়া মাটির গন্ধ গায়ে মাখুন। তারপর সেই দগ্ধ সত্তা নিয়ে প্রবেশ করুন ‘নরক নগরী’র নিয়ন-আলোকিত অন্ধকারে। তবেই এই দুই খণ্ডের অন্তর্নিহিত দর্শন, এই পরাবাস্তব আর অন্তর্ঘাতমূলক রূপকল্পের প্রকৃত স্বাদ আপনি আস্বাদন করতে পারবেন। এই যাত্রা কেবল কবিতা পড়ার যাত্রা নয়, এটি আমাদের নিজেদেরই দর্পণের সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানোর এক নির্মম প্রস্তুতি।

প্রসঙ্গত, কবি টিএম মিলজার হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ নরক ভূমি, নরক নগরী কবি দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।

অমর একুশে বইমেলা ২০২৭, বাজারে আসবে কবি দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নরক নগরী’। কবিতার বইটি প্রকাশ করেছে ইচ্ছে স্বপ্ন প্রকাশনী। বইটির শৈল্পিক প্রচ্ছদে অবদান রেখেছেন শিল্পী ও কথাসাহিত্যিক ধ্রুব এষ।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।