দেশের শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়াতে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থায় আরও নমনীয়তা আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে মূল্য-টু-বুক (P/B) অনুপাতের শর্ত বাদ দিয়ে মূল্য-টু-আয় (P/E) অনুপাতকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া সর্বোচ্চ P/E সীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করার পাশাপাশি মার্জিন কল ও শেয়ার বিক্রির নিয়মেও কিছুটা ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধিত মার্জিন ঋণ বিধিমালা মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিএসইসির কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমায় P/B শর্ত বাদ
বর্তমান খসড়া বিধিমালায় ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI) ও বীমা কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে P/B অনুপাতকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছিল।
খসড়ায় ব্যাংকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ P/B ৩ এবং বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১ নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল। নির্ধারিত সীমার বেশি P/B থাকা শেয়ার মার্জিন ঋণের অযোগ্য হওয়ার কথা ছিল।
তবে নতুন প্রস্তাবে ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে P/B শর্ত বাদ দিয়ে সব খাতের জন্য অভিন্ন P/E-ভিত্তিক কাঠামো চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে বিএসইসি।
প্রস্তাবিত P/E হিসাব করা হবে সর্বশেষ ১২ মাসের আয় বা ট্রেইলিং আর্নিংসের ভিত্তিতে। ফলে কোম্পানির নতুন প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের P/E অনুপাতও পরিবর্তিত হবে।
জীবন বীমা কোম্পানিগুলোকে অবশ্য আলাদা ব্যবস্থার আওতায় রাখা হতে পারে এবং এসব কোম্পানির ক্ষেত্রে P/B অনুপাত প্রয়োগে কিছুটা নমনীয়তা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
P/E সীমা ৪০ করার প্রস্তাব
খসড়া বিধিমালায় সাধারণ খাতের কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ P/E ৩০ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে এই সীমা বাড়িয়ে ৪০ করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এটি অনুমোদিত হলে ট্রেইলিং P/E ৪০ পর্যন্ত থাকা শেয়ার অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে মার্জিন ঋণের আওতায় আসতে পারবে। এর ফলে তুলনামূলক বেশি মূল্যায়নে থাকা কিছু কোম্পানির শেয়ারও মার্জিন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাবে।
মার্জিন ঋণের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
পুঁজিবাজারে তারল্য ও লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে মার্জিন ঋণদাতা স্টকব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও পোর্টফোলিও ম্যানেজারদের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তার মূলধন বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ পাঁচ গুণ পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। বর্তমানে এ সীমা তিন গুণ।
এ সীমা বাড়ানো হলে বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজারের লেনদেনের পরিমাণ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া মার্জিন ঋণের জন্য ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সিইও ফোরাম এ সীমা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
একক শেয়ারে অর্থায়নের সীমাও বাড়ানোর প্রস্তাব
একটি নির্দিষ্ট শেয়ারে মার্জিন ঋণদাতার সর্বোচ্চ এক্সপোজার মোট তহবিলের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে সিইও ফোরাম।
এর ফলে মৌলভিত্তি শক্তিশালী ও সক্রিয়ভাবে লেনদেন হওয়া কোম্পানির শেয়ারে অর্থায়ন বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে নির্দিষ্ট শেয়ারে অতিরিক্ত অর্থ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মার্জিন কল ও বাধ্যতামূলক বিক্রিতে ছাড়
নতুন প্রস্তাবে বিনিয়োগকারীদের মার্জিন কলের পর শেয়ার বিক্রির আগে আরও কিছুটা সময় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোনো বিনিয়োগকারীর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে আগাম নোটিশ দিতে হবে। এরপরও ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রি বা লিকুইডেট করা যাবে।
খসড়া বিধিমালায় তুলনামূলক কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেখানে মার্জিন কল পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীকে প্রয়োজনীয় ইকুইটি পুনঃস্থাপনের জন্য তিন কার্যদিবস সময় দেওয়ার কথা ছিল। এরপর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল।
নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে বাজারে স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতার সময় জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রির চাপ কিছুটা কমতে পারে।
দুর্বল ও বিশেষ শ্রেণির শেয়ারে মার্জিন সুবিধা থাকছে না
মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আগের মতোই বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
Z, N ও G ক্যাটাগরির কোম্পানি, এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ এবং ATB ও OTC প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত শেয়ার মার্জিন ঋণের আওতার বাইরে থাকবে।
কোন ক্যাটাগরি ও শেয়ারগুলো মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য হবে
মূল বোর্ডের A ও B ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোই মূলত মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য হবে।
খসড়া প্রস্তাবে সাধারণ শেয়ারের জন্য মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত ১:১ এবং তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে ১:০.২৫ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
তারল্য বাড়বে, তবে বাড়বে ঝুঁকিও
বিএসইসির প্রস্তাবিত সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো মার্জিন ঋণের সুযোগ বাড়িয়ে পুঁজিবাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারের লেনদেনও বাড়াতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
তবে মার্জিন ঋণের সুযোগ বাড়লে বাজারে লিভারেজ বা ঋণনির্ভর বিনিয়োগও বাড়তে পারে। এতে বাজার নিম্নমুখী হলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি মার্জিন কল ও বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির চাপও তৈরি হতে পারে।
P/B শর্ত বাতিল, P/E-এর সর্বোচ্চ সীমা, ন্যূনতম বিনিয়োগ, বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির সীমা এবং একক শেয়ারে অর্থায়নের সর্বোচ্চ এক্সপোজারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে মঙ্গলবারের কমিশন সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
Author
-
'অর্থ লিপি ডট কম' একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বাজার ভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অর্থ ও বাণিজ্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশ করে।
View all posts
'অর্থ লিপি ডট কম' শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য সততার সহিত পরিবেশন করে এবং কোন সময় অতিরঞ্জিত, ভুল তথ্য প্রকাশ করেনা এবং গুজব ছড়ায়না, বরং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে বদ্ধ পরিকর। এটি একটি স্বাধীন, নির্দলীয় এবং অলাভজনক প্রকাশনা মাধ্যম।